মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৫৫
৮
রাত এগারোটা। দ্য চেম্বার্স, তাজমহল প্যালেস, দক্ষিণ মুম্বই।
দক্ষিণ মুম্বইয়ের কোলাবা কজওয়ে এখনো পুরোপুরি ঘুমোয়নি, তবে তার চঞ্চলতা অনেকটাই স্তিমিত। তাজমহল প্যালেসের ঠিক পেছনে, আরব সাগরের কালো জলের ওপর নোঙর করে থাকা কয়েকটা ইয়ট সমুদ্রের হাওয়ায় হালকা দুলছে।
সাগরের জল স্পর্শ করে আসা সেই হাওয়ায় একটা নোনতা গন্ধ আছে, যেটা মুম্বইয়ের নিজস্ব। কিন্তু বোম্বে প্রেসিডেন্সি ক্লাবের এই লাউঞ্জটার ভেতর সেই নোনা বাতাস ঢোকার কোনো পথ নেই।
এখানকার বাতাস সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত, ফিল্টার্ড এবং কৃত্রিম সুবাসে মোড়া। সেটা এখানকার শান্ত, অভিজাত পরিবেশের সাথে দারুণ মানিয়ে যায়।
হলঘরের দেওয়ালগুলো বার্মিজ টিক কাঠের প্যানেলিংয়ে ঢাকা। সিলিং থেকে এন্টিক ক্রিস্টালের শ্যান্ডেলিয়ার ঝুলছে। তার মৃদু আলো দেওয়ালে টাঙানো দামী তৈলচিত্রগুলোর ওপর এসে পড়েছে। মেঝেতে বিছানো দামী পার্সিয়ান কার্পেট।
ঘরের বাতাসে দামি সিগার আর ব্লু-লেবেল স্কচের গন্ধ। স্পিকারে খুব নিচু গ্রামে ক্লাসিক্যাল জ্যাজ মিউজিক বাজছে।
চারপাশে যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তারা কেউ আমলা, কেউ ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার, কেউ দেশের লজিস্টিকস এবং মেরিটাইম ইন্ডাস্ট্রির বড়সড় ব্যক্তিত্ব।
আজ উপস্থিত আছেন মিনিস্ট্রি অফ শিপিং-এর দু-একজন পদস্থ আমলা, ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ শিপিং-এর প্রাক্তন ডিরেক্টর, যিনি এখন তিনটে মাল্টিন্যাশনাল লজিস্টিকস বোর্ডের ডিরেক্টর; মিনিস্ট্রি অফ সারফেস ট্রান্সপোর্টের একজন অত্যন্ত ক্ষমতাশালী জয়েন্ট সেক্রেটারি; বড় বড় শিপিং লাইনের প্রমোটাররা আর জনাচারেক আন্তর্জাতিক ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার, যাদের পারমিশন ছাড়া ভারতের কোনো বন্দরে একটা কন্টেইনারও নামে না।
এখানে আলোচনা নিচু স্বরে হয়, কোন অট্টহাস্য নেই, কোনরকম ঠাট্টা-ইয়ার্কি নেই, কান পাওলে চামচ বা কাঁচের টুংটাং শব্দ শুনতে পাওয়া দুষ্কর।
উপস্থিত সকলেই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, অথচ প্রত্যেকেই এখানে এসেছেন এক অদৃশ্য সামাজিক চুক্তি মেনে।
একে অপরকে পরখ করতে, নিজেদের ক্ষমতাটা আর একটু ঝালিয়ে নিতে।
এই ভিড়ের মধ্যেও অরুণ চ্যাটার্জীকে আলাদা করে চিনে নিতে কষ্ট হয় না। চারকোল-ব্ল্যাক আর্মানি স্যুট খানা তার লম্বা শারীরিক গঠনের সাথে দারুণভাবে মানিয়ে গেছে। ডান হাতের কব্জিতে লনজিনের ঘড়িটা মৃদু আলোয় চকচক করছে। বাঁ হাতে ধরা ক্রিস্টাল গ্লাসে গ্লেনফিডিক-২১। বরফ ছাড়াই।
মিটিং শেষ হবার পরে তিনদিন কেটে গেলেও অরুণের কলকাতায় ফেরেনি। ফ্লাইট টিকিট রি-শিডিউল করে সে মুম্বইয়েই থেকে গেছে।
মিস্টার গুপ্তা কথা মতো ইস্টার্ন জোনের অপারেশনাল ইস্যু নিয়ে তার আর প্রশান্তের সাথে আলাদাভাবে মিটিংয়ে বসেছিলেন। গুপ্তাসাহেবের কথা মতো তাদের উপর দায়িত্ব বাড়বে। কিন্তু, সেসব নয়, অরুণের মাথায় ঘুরছে অন্য কথা...।
মিস্টার গুপ্তার কথানুযায়ী পাঁচমাস পরে অনুষ্ঠিত হতে চলা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বর্তমান শাসক দল নাকি গো হারা হারতে চলেছে।
শুনে অরুণ চমকে উঠেছিল। কোথায় নির্বাচন, তার দিনক্ষণ ঘোষণা হল না, কে প্রার্থী হবে তার ঠিক নেই অথচ নির্বাচনের ফলাফল ঠিক হয়ে গেল ?
তার মুখের ভাব দেখে গুপ্তা সাহেব ছোট্ট একটা মুচকি হাসি হেসেছিলেন। তিনি বোধহয় আন্দাজ করতে পেরেছিলেন সে কী ভাবছে।
অরুণ গ্লাসে একটা চুমুক দিল।
গুপ্তাসাহেবের কথা সঠিক হলে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে অনেক কিছু ঘটতে চলেছে। এখন তাকে খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। এইসময় তো তার এক্সাইটেড থাকার কথা, কিন্তু সে জায়গায় এত ম্যাড়ম্যাড়ে লাগছে কেন ?
এরকম জীবনই তো সে বরাবর চেয়ে এসেছে। হাই রিস্ক, হাই রিওয়ার্ড।
আসলে, কলকাতা তাকে টানে না।
কলকাতা ফেরা মানেই আবার সেই বিদিশার হাঁড়ির মতো মুখ। যেটা দেখলেই মনে বিতৃষ্ণা জাগে। বিদিশার সঙ্গ এখন অরুণের কাছে মরুভূমির মতো। যা ভালবাসার বদলে শুধু বিরক্তির জন্ম দেয়।
গড়িয়ার বাড়িটাকে মনে হয় সাজানো গোছানো একটা খাঁচার মতো। এমনই দমচাপা পরিবেশ যে দরজা ঠেলে ভেতরে পা দিলেই বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে আসে। বসার ঘরের সোফা, দেওয়ালে টাঙানো ছবিটা, এমনকী ঘরের মৃদু আলোটাও যেন ওকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কোথা থেকে একটা তীব্র অপরাধবোধ এসে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। সাথে সাথে ও কেমন অদ্ভুতভাবে গুটিয়ে যায়।
অরুণ অন্যমনস্কভাবে গ্লাসে একটা বড় চুমুক দিল।
মাঝে মাঝে ওর সন্দেহ হয় বিদিশা বাড়িটায় কোন তান্ত্রিক ক্রিয়া-টিয়া করে রেখেছে কিনা। নইলে সে নিজের বাড়িতে ঢুকতে এতটা ভয় পাবে কেন?
নাহ, যত্তসব আজেবাজে চিন্তা !
ওর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বিদিশার কোন আইডিয়া নেই। ইদানীং ও আবার একটা কলেজে জয়েন করেছে। রোজ সকালে বেরিয়ে যায় আর রাত করে বাড়ি ফেরে।
অরুণ বুঝতে পারে যে বিদিশা এখন নিজের মতো একটা জগৎ তৈরি করে নিয়েছে, যেখানে তার কোনো প্রবেশাধিকার নেই। সেও চায় না ওখানে প্রবেশ করতে।
অরুণের কাছে দাম্পত্য জীবনটা এখন একটা সার্টিফিকেটের মতো। ফাইলেই মানায় ভালো, ড্রয়ারে বন্ধ থাকলে তো আরও ভালো।
৯
অরুণ একহাতে সিঙ্গল মল্টের গ্লাস নিয়ে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল।
"মিস্টার চ্যাটার্জী! আপনি এখানে ? হোয়াট আ প্লেসেন্ট সারপ্রাইজ!"
অরুণ ঘুরে দাঁড়াল। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মিস্টার সিংঘানিয়া, এই শহরের অন্যতম বড় শিপিং টাইকুন। তার পাশে এক অত্যন্ত সুন্দরী যুবতী। বয়স কোন মতেই তিরিশের বেশি হবে না।
"গুড ইভিনিং, মিস্টার সিংঘানিয়া", অরুণ তার স্বভাবসিদ্ধ হাসিটা মুখে টেনে আনল।
"মিট মিস অনন্যা মালহোত্রা।"
সিংঘানিয়া তার গ্লাসের রাম দিয়ে অনন্যার দিকে ইঙ্গিত করলেন, "আমাদের নতুন লিগ্যাল হেড। যেমন শার্প ব্রেন, তেমনই চমৎকার ফোরসাইট। অ্যান্ড অনন্যা, ইনি অরুণ চ্যাটার্জী। ইস্টার্ন জোনের ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং ও শিপিং সার্কিটে ওঁর পারমিশন ছাড়া একটা পাতাও নড়ে না।"
অনন্যা হাত বাড়িয়ে দিল। তার আঙুলে হিরের একটা সূক্ষ্ম রিং, নেলপলিশের রঙটা গাঢ় ওয়াইন কালারের।
অরুণের আর্মানি স্যুটের কাঁধ থেকে শুরু করে লনজিনের ঘড়ি পর্যন্ত তার চোখজোড়া একবার আলতো করে ছুঁয়ে গেল।
"আই হ্যাভ হার্ড আ লট অ্যাবাউট ইউ, মিস্টার চ্যাটার্জী।"
"প্লেজার ইজ মাইন, মিস মালহোত্রা।" অরুণ গ্লাসে একটা হালকা চুমুক দিয়ে বলল।
"তবে প্রশংসাটা একটু বেশি হয়ে গেল, মিস্টার সিংঘানিয়া। কলকাতায় কাজ করা মানে প্রতিদিন নতুন একটা সার্কাসের রিং-এ ঢোকা। পলিটিক্স আর ইউনিয়নের দড়ি টানাটানির মাঝে আমাদের স্রেফ টিকে থাকতে হয়।"
অরুণ অনন্যাকে সাইড করে সিংঘানিয়ার দিকে ফিরে কথাটা বলল।
সিংঘানিয়া একটা হালকা শব্দ করে হাসলেন।
"তোমরা শুধু সারভাইভ করে বেঁচে নেই অরুণ, তোমরা রীতিমতো রুল করো। বাই দ্য ওয়ে, তুমি একা নাকি ? আর কাউকে তো দেখছি না?"
"স্যার একটু দুবাই গিয়েছেন। জোনাল অফিসের কিছু জরুরি ফাইল ক্লিয়ার করার ছিল।"
অরুণ টোপটা না গিলে খুব স্বাভাবিকভাবে কথাগুলো বলল।
"আই সি।", সিংঘানিয়া একটা হালকা শব্দ করে হাসলেন, কিন্তু তার চোখ দুটোতে সেই হাসিটা পৌঁছল না।
তারপর একটু নিচু গলায় বললেন, "দিল্লির হাওয়া যা বুঝছি অরুণ, খুব তাড়াতাড়ি ইস্টার্ন জোনের খোল-নলচে বদলাতে চলেছে। ডিপি ওয়ার্ল্ড নাকি অলরেডি নতুন পোর্টের জন্য বিড সাবমিট করতে চলেছে। আই হোপ, তোমরা ব্যাকফুটে নেই?"
অরুণের চোয়ালটা এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হলো, কিন্তু সে মুখে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ পেতে দিল না। রাজ্যে সরকার বদলানোর পরে পশ্চিমবঙ্গে একটা নতুন ডিপ সি- পোর্ট অনুমোদন পাবার কথাটা সম্পূর্ণ টপ-সিক্রেট ছিল।
গুপ্তাসাহেব গত পরশু মিটিংয়ে শুধু তাকে আর প্রশান্তকে এটা জানিয়েছেন।
সিংঘানিয়া এই খবর কোত্থেকে বের করলেন?
"আমাদের হোম গ্রাউন্ডে আমরা কখনো ব্যাকফুটে থাকি না, মিস্টার সিংঘানিয়া।"
অরুণ স্মিত হেসে বলল।
"দ্যাটস লাইক আ ট্রু প্লেয়ার" কথাটা বলে সিংঘানিয়া অনন্যার দিকে তাকিয়ে একটু চোখ টিপলেন, তারপর অরুণের দিকে ঝুঁকে এলেন।
তার মুখ থেকে দামি মদের গন্ধ বেরোচ্ছে।
"রাজনীতি নিয়ে ভাববেন না, মাই ফ্রেন্ড। হাওয়া কোন দিকে ঘুরছে, সেটা দিল্লি আর নাগপুর অনেক আগেই ঠিক করে ফেলে। পাঁচ মাস পরের রেজাল্টটা জাস্ট একটা ফর্ম্যালিটি। আসল খেলাটা রেজাল্টের পরদিন থেকে শুরু হবে। রাইটার্স বিল্ডিংয়ে নতুন মুখ বসলে, ইস্টার্ন জোনের পুরো লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক বদলে যাবে। আর, এই বিষয়টা যে লিগ্যাল টিম হ্যান্ডেল করবে তাতে অনন্যা থাকবে।"
সিংঘানিয়া অনন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"অনন্যা, তুমি বরং মিস্টার চ্যাটার্জীর সাথে একটু কথা বলো। ইস্টার্ন জোনের মেরিটাইম ডিস্পিউটসের যে ফাইলটা নিয়ে তুমি কাজ করছ, ওঁর চেয়ে ভালো গাইড আর কেউ হবে না। আমি ওদিকের টেবিলে জয়েন্ট সেক্রেটারি সাহেবের সাথে একটা জরুরি কথা সেরে আসছি।"
সিংঘানিয়া চলে যেতেই লাউঞ্জের মৃদু আলোয় অরুণ, অনন্যার দিকে তাকাল। সে তখন খুব নিস্পৃহভাবে তার ককটেল গ্লাসে স্ট্র-টা ঘোরাচ্ছে। তার পারফিউমের হালকা কস্তুরীর সুবাস অরুণের নাকে ধাক্কা দিল।
অরুণ লক্ষ্য করল অনন্যার চোখের মণি দুটো স্থির। সে অরুণের প্রতিক্রিয়াটা খুব খুঁটিয়ে লক্ষ্য করছে।
"আপনার কাজটা তো বেশ চ্যালেঞ্জিং", অরুণ আলতো করে বলল।
"কিন্তু নতুন রুটে যদি চোরাবালি থাকে?"
"চোরাবালি এড়ানোর জন্যই তো এক্সপার্ট গাইড লাগে, মিস্টার চ্যাটার্জী," অনন্যা চটজলদি জবাব দিল। তার ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি।
"সঠিক সময়ে সঠিক চ্যানেলটা বেছে নিলে চোরাবালিও পার হওয়া যায়। বাই দ্য ওয়ে, আপনি কি পার্সোনালি কোনো চ্যালেঞ্জ ফেস করছেন কলকাতায়? আই মিন, অপারেশনাল লেভেলে?"
অনন্যা প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক ভাবে করল।
হোয়াট দ্য ফাক !
অরুণের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
কে খবরটা বাইরে পাচার করতে পারে ?
অরুণের মনে সবার আগে রাজীব মাথুরের মুখটাই ভেসে উঠল। বাস্টার্ডটা প্রথম দিন থেকে ওর পেছনে লেগে আছে।
অরুণ নিজেকে দ্রুত সামলে নিল। মুখের হাসিতে কোনো ফাটল ধরতে দিল না।
"কলকাতায় চ্যালেঞ্জ সব সময়ই থাকে, মিস মালহোত্রা। তবে সেগুলোকে হ্যান্ডেল করার অভ্যেস আমাদের আছে।"
অনন্যা এবার অরুণের আরেকটু কাছে এগিয়ে এল। জ্যাজের সুরটা স্পিকারে এখন আরও মায়াবী শোনাচ্ছে। বাতাসে অনন্যার দামি পারফিউমের গন্ধটা অরুণের নাকের কাছে এসে ধাক্কা মারল।
"মিস্টার চ্যাটার্জী, এখানে বড্ড ফর্মাল পরিবেশ" অনন্যা গ্লাসটা কাউন্টারে নামিয়ে রাখল।
"তাছাড়া, এই ঘরের কান কিন্তু খুব সজাগ। চলুন, একটু বাইরের ব্যালকনিতে যাওয়া যাক ? আরব সাগরের হাওয়াটা এখানকার আর্টিফিশিয়াল সেন্টের চেয়ে অনেক খাঁটি।"
অরুণ অনন্যার চোখের দিকে তাকাল। সেখানে একটা স্পষ্ট আমন্ত্রণ আছে, কিন্তু সেই আমন্ত্রণের আড়ালে যদি কোনো ফাঁদ লুকিয়ে থাকে ?
এতটা সময় নষ্ট করার পরিকল্পনা অরুণের ছিল না, পার্টিতে এতক্ষণ কেটে যাবে ভাবেনি ও। ঘড়ির কাঁটা যা বলছে, এতক্ষণে রাইনার কাছে পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল তার।
অনন্যার কথাবার্তা, প্রত্যেকটা অঙ্গভঙ্গি যেন এক-একটা ধাঁধা। কোনো দাবাড়ু যেমন প্রতিটা চালের পেছনে একটা অদৃশ্য ফাঁদ লুকিয়ে রাখে, অনন্যার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে ঠিক তেমন ভাইব টের পাচ্ছে ও।
হাই রিস্ক, হাই রিওয়ার্ড।
অরুণের ভেতরের সেই চেনা অ্যাড্রেনালিন রাশটা আবার চাড়া দিয়ে উঠল।
১০
কাঁচের ভারী দরজাটা ঠেলে ওরা বাইরে বেরোনোর সাথে সাথেই একটা নোনা বাতাসের ঝাপটা এসে অরুণের মুখে লাগল। কোলাবা কজওয়ের আলো এসে আরব সাগরের বুকে চুঁইয়ে পড়ছে।ইয়টগুলো হাওয়ায় অন্ধকার জলের বুকে ভূতের মতো দুলছে।
অনন্যা রেলিংয়ের ওপর দুই হাত রাখল। বাতাসে তার সিল্কের গাউনটা হালকা উড়ছে। সে অরুণের দিকে না তাকিয়েই সাগরের কালো জলের দিকে চোখ রেখে খাঁটি বাংলায় বলল,
"মিস্টার চ্যাটার্জী, ডিপি ওয়ার্ল্ড কিন্তু শুধু বিডের কাগজপত্র বানিয়ে বসে নেই। তারা অলরেডি ওখানকার লোকাল পলিটিক্যাল ব্যাকডোর ম্যানেজ করা শুরু করেছে। আর চার মাস পরের নির্বাচনের যে হাওয়া... তাতে শাসক দলের গদি ওল্টানোর সাথে সাথে হলদিয়া আর কলকাতা পোর্টের পুরো কন্ট্রোল শিফট হবে। অনেক লাইসেন্স বাতিল হবে। পুরোনো সিন্ডিকেট হটবে, নতুন প্লেয়ার আসবে। আপনি সত্যিই তৈরি তো ?"
অরুণ ভয়ানক চমকে উঠল।
মেয়েটা কে ?
"আপনি বড্ড বেশি জানেন দেখছি, মিস মালহোত্রা।"
অরুণের গলার স্বর এবার কিছুটা ঠান্ডা শোনাল।
অনন্যা ঘুরে দাঁড়িয়ে আলতো করে হাসল। চাঁদের আলোয় তার মুখটা অদ্ভুত সুন্দর, কিন্তু একই সাথে মারাত্মক রহস্যময় দেখাচ্ছে।
সে নিজের গ্লাসটা অরুণের গ্লাসের গায়ে হালকা করে ছুঁইয়ে দিল। 'টুং' করে একটা হালকা শব্দ হলো, যা সাগরের ঢেউয়ের কোলাহলে হারিয়ে গেল।
"জানতে হয়, মিস্টার চ্যাটার্জী। বিশেষ করে তখন, যখন আমরা একই বোর্ডে চাল দিচ্ছি। সাবধানে ফিরবেন।"
অনন্যা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। একটা রহস্যময় হাসি বাতাসে ভাসিয়ে রেখে সে আবার লাউঞ্জের ভেতরে চলে গেল। কাঁচের দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল।
অরুণ একা দাঁড়িয়ে রইল ডেকে। তার হাতের গ্লেনফিডিক-২১ এখন পুরোপুরি তেতো লাগছে।
এমন সময় ---
বজজজ! বজজজ!
অরুণের সুটের ভেতরের পকেটে রাখা সাইলেন্ট করে রাখা ফোনটা তীব্রভাবে ভাইব্রেট করে উঠল। অরুণের এই মুহূর্তে ফোন ধরতে ইচ্ছা করছিল না।
কিন্তু...পকেট থেকে ফোনটা বের করে সেন্ডারের নাম দেখে ওর ভুরুটা কুঁচকে গেল।
এই 'J' নামের রহস্যময় লোকটা এর আগেও তাকে বেশ কয়েকবার মেসেজের মাধ্যমে ইনফরমেশন দিয়েছে।
অরুণ অনেক চেষ্টা করেও এর পরিচয় বার করতে পারেনি।
মেসেজের ইনবক্সটা খুলতেই স্ক্রিনের ওপর ভেসে ওঠা কয়েকটা শব্দ পড়ার সাথে সাথে অরুণের ভুরু কুঁচকে গেল।
মেসেজে লেখা:
"মুম্বইয়ে আর কতদিন ফুর্তি করে বেড়াবেন ? কলকাতায় ফিরে আসুন। অমৃতা তো আপনার পথ চেয়ে বসে আছে।"
রাগে অরুণের গা রি রি করে উঠল। সে হাতের গ্লাসটা শক্তভাবে চেপে ধরল।
"অমৃতা!"
নামটা মনে মনে উচ্চারণ করতেই অরুণের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
কেউ তার পিছনে লেগেছে আর সেটা বাইরের লোক নয়। অফিসেরই লোক, নইলে ইস্টার্ন জোনে অপারেশনাল ইস্যু নিয়ে সমস্যা চলছে সেটা অনন্যা জানবে কীভাবে ?
সিংঘানিয়া মিনিস্ট্রির টপ লেভেল থেকে পশ্চিমবঙ্গে নতুন পোর্ট তৈরি হবার খবর পেতেই পারে। কিন্তু, ওর অফিসের প্রবলেমের খবর অনন্যা কীভাবে পাবে ?
রাজীব ?
মোস্ট প্রবাবলি। কিন্তু, সে একা অপারেট করছে বলে তো মনে হচ্ছে না। কলকাতা থেকে ওকে কেউ নিয়মিত খবর পাঠাচ্ছে।
কলকাতার অফিসে এই মুহূর্তে এমন কে আছে, যে অরুণের ক্ষমতার ভিতটা নাড়িয়ে দিতে চায়?
নাকি.........অফিস নয়, ঘরের মধ্যেই বিভীষণ বাস করছে ?
অরুণ ফোনটার স্ক্রিনের দিকে তাকালো। ডিসপ্লের আলোয় অন্ধকারে ওর চোখের মণি দুটো জ্বলজ্বল করছে।
বিদিশা !
ভাবতেই অরুণের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
নাহ, বিদিশা কর্পোরেট পলিটিক্সের কিছু বোঝে না, অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হয়। কিন্তু, বিদিশার স্বভাব আছে ড্রয়ার খুলে ওর কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করার। এর আগেও সে বিদিশাকে হাতেনাতে ধরেছে।
আর, এখন বিদিশার যা হাবভাব তাতে কোনভাবেই তাকে সন্দেহের উর্ধ্বে রাখা যায় না।
আজ কেন ?
বিদিশার আচরণ অনেকদিন পাল্টে গেছে। সেই চার বছর আগে ইতালি থেকে ফেরার পর থেকেই। কিন্তু, ইদানীং ও যা শুরু করেছে, সকাল সকাল যেভাবে সাজগোজ করে কাজে বেরোয়, তাতে মনে হয় কলেজে নয় মডেলিং ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পেয়েছে।
অথচ, এই বিদিশা একটা সময় বছরের পর বছর, মাসের পর মাস কোন সাজগোজ না করে সাধারণ শাড়ি পরে কাটিয়ে দিয়েছে।
ওর আগেই বোঝা উচিত ছিল যে বড়সড় কোন গন্ডগোল ঘটেছে।
আর মাসের পর মাস ভেতরের খবর সাপ্লাই করে যাওয়া এই 'J' ? সে কি শুভাকাঙ্ক্ষী নাকি কোন শত্রু ?
যদি ‘J’ অন্য কেউ না হয়ে বিদিশাই হয়?
ভাবতেই ভাবতেই অরুণ তার পার্সোনাল সেক্রেটারিকে ডায়াল করল। ও প্রান্ত থেকে ফোন অরুণের গলার স্বর বরফের মতো ঠান্ডা শোনাল:
“সাগর, যেভাবে হোক কাল ভোরের ফ্লাইটে আমার কলকাতার টিকিট করো। আর শোনো, কাল দুপুর বারোটার মধ্যে সমস্ত ইন্টারনাল অডিট রিপোর্ট আমার টেবিলে চাই।”
ফোনটা কেটে অরুণ আরব সাগরের কালচে জলের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, সে একটা মাকড়সার জালের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, যার সুতোগুলো কলকাতা থেকে বোনা হয়েছে।
কলকাতার টান ও কখনো সেভাবে অনুভব করেনি ঠিকই, কিন্তু আজ এই মুহূর্তে অরুণের মনে হচ্ছে, শহরটা যেন ওকে গিলতে আসছে।