জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ১৩

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73076-post-6191488.html#pid6191488

🕰️ Posted on Wed Apr 22 2026 by ✍️ Mr. X2002 (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1088 words / 4 min read

Parent
পর্ব ১৩: অভিমান পরদিন কলেজটা যেন একটা মৌচাক। হেডমাস্টার সাহেব দরজায় দরজায় গিয়ে যখন বনভোজনের ঘোষণা দিলেন, বাচ্চাদের চিৎকারে ক্লাসরুমের জানালার কাচ কেঁপে উঠল। "এই বৃহস্পতিবার পিকনিক। নির্দিষ্ট চাঁদা দিলেই যাওয়া যাবে, আর নিরাপত্তার জন্য বাবা-মাকেও সাথে নেওয়ার অনুমতি মিলেছে। মিরাজ লাফিয়ে উঠল, ঝুমুর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। খুশিতে ক্লাসঘর ভরে গেল।" কিন্তু সেই খুশির ঢেউ ঝুমুর জীর্ণ দরজায় এসে মুখ থুবড়ে পড়ল। রাত আটটা। রান্নাঘরের বাতিটা জ্বলছে। মাকড়সা বাসা করে রেখেছে। । চুলার আগুনের আঁচে চৈতির কপাল বিন্দু বিন্দু ঘামে ভিজে গেছে। পেঁয়াজের ঝাঁজে চোখ জ্বলছে, নাকি অন্য কিছুর জ্বালায়—বোঝা যায় না। খুন্তি নেড়ে সে ভাতের মাড় দেখছে। দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে আছে ঝুমু। আঙুল মটকাচ্ছে, জামার কোণা পাকাচ্ছে। কথাটা গলার কাছে এসে বারবার আটকে যাচ্ছে। “মা…” গলাটা কেঁপে গেল ঝুমুর। “কলেজ থেকে পিকনিকে নিয়ে যাবে। সবাই যাচ্ছে।” চৈতি ফিরেও তাকাল না। খুন্তিটা কড়াইয়ে ঠক করে শব্দ করল। “সবাই গেলে তোমাকেও যেতে হবে? পড়ার নামে তো অষ্টরম্ভা। দিন দিন রেজাল্টের যা ছিরি হচ্ছে, ঘরে বসে বইয়ে মুখ গুঁজে থাকো।” মায়ের গলার বরফ-ঠান্ডা সুরটা ঝুমুর বুকের ভেতরটা খালি করে দিল। সে এক পা এগিয়ে মায়ের ভেজা ওড়নার খুঁটটা মুঠো করে ধরল। “তুমি এমন করো কেন মা? মিরাজের মা-ও তো যাবে। আমাকে কেন যেতে দেবে না?” এবার চৈতি ঘুরে দাঁড়াল। চুলার লাল আভা তার চোখেমুখে পড়েছে। ক্লান্তি, বিরক্তি, আর একরাশ চাপা আগুন মিশে আছে সেখানে। হাতের চাকুটা বোর্ডের উপর রেখে সে হিসহিস করে উঠল, “বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস দিন দিন। মুখে মুখে তর্ক করা শিখেছিস? ইদানীং তোর মুখে খালি আজেবাজে কথা। এখন আবার জেদ? এই কলেজটাই আমি বদলে দেব। মানুষ কলেজে যায় পড়ালেখা শিখতে, আর তুই শিখছিস শুধু মর্জি করা!” মায়ের প্রতিটা শব্দ ঝুমুর ছোট্ট বুকের পাঁজরে গিয়ে বিঁধল। তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। পা দাপিয়ে, কান্না চেপে সে চিৎকার করে উঠল, “না! আমি যাব! আমি পিকনিকে যাবই!” ব্যস, এতদিনের জমানো বারুদে যেন আগুন লাগল। চৈতির গলার স্বর সপ্তমে উঠল। “যা! তুই যা! নিজের মুরোদে টাকা জোগাড় করে যেখানে খুশি যা! আমার কাছে একটা ফুটো পয়সাও পাবি না। তোর যা ইচ্ছা কর!” অভিমানে, রাগে অন্ধ হয়ে ঝুমু বলে বসল, “তুমি টাকা দেবে কোত্থেকে? তোমার কাছে টাকা আছে নাকি? আমি লোকনাথ কাকুর কাছ থেকে নিয়ে নেব। কাকু অনেক ভালো। কাকু ঠিকই আমাকে টাকা দেবে।” ‘লোকনাথ’—নামটা শুনেই চৈতির মাথার ভেতরটা দপ করে জ্বলে উঠল। কানের পাশ দিয়ে গরম হলকা বেরিয়ে গেল যেন। লোকটা বাড়ির কাজের লোক, কিন্তু তার চোখের চাহনি, অকারণে আশেপাশে ঘোরাঘুরি—সব মিলিয়ে একটা অস্বস্তি চৈতির শিরদাঁড়া বেয়ে নামে। তার উপর নিজের মেয়ের মুখে এই বিশ্বাস! দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে সে ফুঁসে উঠল, “তাহলে যা! ওই লোকনাথকেই গিয়ে বাবা ডাক! আমাকে আজ থেকে মা বলে ডাকবি না। ওর কাছেই গিয়ে থাক তুই!” ঝুমু আর সহ্য করতে পারল না। কান্নায় ভেঙে পড়ে চিৎকার করল, “তাও ভালো!” বলেই সে দরজার দিকে ছুটল। ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে রেহানা বেগম বেরিয়ে এলেন। পান চিবোতে চিবোতে এতক্ষণ সবই শুনছিলেন। দরজার কাঠে হেলান দিয়ে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “আহা, কী করছ বউমা? দুধের বাচ্চা, একটু আনন্দ করতে চায়। এই বয়সে ঘুরবে না তো কবে ঘুরবে? কেন ওর সাথে এমন করছো?” চৈতি চুলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। গলার কাছে দলা পাকানো কান্নাটা সে জোর করে চাপা দিল। “মা, ওর যা ইচ্ছা করুক। আমি আর কিছু বলব না। আমি তো এখন ওর চোখের শত্রু!” রেহানা বেগম কাঁপা হাতে ঝুমুকে বুকের কাছে টেনে নিলেন। নাতনির ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না তার বুকের পাঁজর ভেঙে দিচ্ছে। স্বামী নিখোঁজ , ছেলে পলাতক—এই ভাঙা সংসারে অভাবের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতার কাঁটা। তিনি বোঝেন, বউমা আসলে ঝুমুর উপর রাগ করেনি। সে রাগ করেছে নিজের পোড়া কপালের উপর, এই বন্দী জীবনের উপর। কিন্তু রেহানা বেগম কী করবেন? একদিকে সন্তান-স্বামীর শূন্য জায়গা, অন্যদিকে নাতনির চোখের জল—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে এই সন্ধ্যায় তার নিজেকেই পৃথিবীর সবচেয়ে একা মানুষ মনে হচ্ছে। রাতের ডিনার টেবিলে বসে আছে চারজন—লোকনাথ, সীমা, ঝুমু আর রেহানা বেগম। ভাতের ধোঁয়া উঠছে, ডালের বাটি থেকে মশলার গন্ধ ভাসছে, কিন্তু কারও মুখে কথা নেই। টেবিলের মাঝখানে পড়ে থাকা নীরবতা যেন ভাতের চেয়েও ভারী। রেহানা বেগম গলা একটু চড়া করে ডাকলেন, “ও বউমা, খেতে এসো। আর কত রাগ করে থাকবে? এই রাগারাগি আমার আর ভালো লাগে না।” উত্তর এল না। চৈতির বেডরুমের দরজা শক্ত করে আঁটা। ভেতরে সে ঐশীকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে। ঐশী বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “মা, আমি এখন ঘুমাবো না।” চৈতির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। “একটা চড় মারব বেয়াদব মেয়ে। ঘুমাবি না কেন? কী, এখন বড় হয়ে গেছিস? এখন আর মাকে লাগে না, না?” তার গলার ঝাঁঝ দেওয়াল ভেদ করে ডাইনিং পর্যন্ত এল। টেবিলে বসা চারজন আরও জমে গেল। সীমা শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে নিচু গলায় বলল, “আজ মনে হয় চৈতি ভাবি আসবে না। আমরা খেয়ে নিই?” কেউ উত্তর দিল না। কাঁটাচামচের টুংটাং শব্দটাও আজ অপরাধ মনে হচ্ছে। আরও পাঁচ মিনিট কেটে গেল। চৈতির ঘর থেকে কোনো সাড়া নেই। শেষে ক্ষুধার কাছে হার মেনে সীমা কাঁপা হাতে নিজের প্লেটে ভাত তুলে নিল। নিঃশব্দে একটু ডাল মাখিয়ে মুখে দিল। তার দেখাদেখি ঝুমুও প্লেট টেনে নিল। মাথা নিচু করে ভাত নাড়ছে, কিন্তু খাচ্ছে না। রেহানা বেগম আর লোকনাথ একে অপরের দিকে তাকালেন। তারাও অনিচ্ছায় প্লেটে হাত দিলেন। ঠিক যখন রেহানা আর লোকনাথ প্রথম ন্যালা মুখে তুলতে যাবে—**ক্যাচ** করে একটা শব্দ। চৈতির ঘরের দরজা খুলে গেল। চৈতি দরজায় দাঁড়িয়ে। চোখ দুটো লাল, চুল এলোমেলো, মুখে সারাদিনের ক্লান্তি আর জমাট রাগ। তার চোখ গিয়ে পড়ল একদম লোকনাথের উপর। লোকনাথ তখন ভাতের প্রথম ন্যালাটা মুখের সামনে ধরে আছে। এক সেকেন্ড। দুজনের চোখাচোখি হলো। কোনো কথা নেই, কিন্তু হাজারটা কথা হয়ে গেল সেই দৃষ্টিতে। লোকনাথের হাতটা বাতাসে থেমে গেল। ন্যালাটা আর মুখে উঠল না। প্রায় একই সাথে রেহানা বেগমও নিজের হাতটা নামিয়ে নিলেন। আঙুলের ফাঁক থেকে ভাতের দলাটা টুপ করে প্লেটে পড়ে গেল। লোকনাথ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। পাশের চেয়ারটা টেনে চৈতির দিকে একটু এগিয়ে দিয়ে বলল, “ভাবী, রাগ করে থাইকেন না। ডিনারটা খেয়ে নেন। না খেলে শরীর অসুস্থ হয়ে যাবে।” চৈতি এবার পানির বোতলটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। লোকনাথের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন চোখ দিয়েই ভস্ম করে দেবেন। গলার স্বর হিমের মতো ঠান্ডা। “তুমিই খাও। আর তোমার মেয়েকে খাওয়াও।” ‘তোমার মেয়ে’—শব্দটা ঘরের বাতাসে চাবুকের মতো বাড়ি মারল। ঝুমু চমকে মাথা আরও নিচু করল। কথা শেষ করেই চৈতি ঘুরে দাঁড়ালেন না। চৈতি এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে দরাম করে দরজাটা লাগিয়ে দিল। শব্দটা পুরো বাড়িতে কেঁপে উঠল। তারপর দুই মিনিট। পিনপতন নীরবতা। শুধু দেওয়াল ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ। সীমা প্রথমে নড়ল। ঢোক গিলে আবার খাওয়া শুরু করল। একে একে বাকিরাও। কিন্তু ভাত এখন আর শুধু ভাত নেই, গলায় কাঁটার মতো বিঁধছে। খাওয়া শেষ হলে রেহানা বেগম আঁচলে মুখ মুছলেন। ঝুমুর মাথায় হাত রেখে নরম গলায় বললেন, “আয় তো দাদুভাই, আজ তোর মায়ের সাথে ঘুমাতে হবে না। আজ দাদি-নাতনি একসাথে ঘুমাবো। অনেক গল্প করব, কেমন?” ঝুমু কোনো কথা না বলে চুপচাপ দাদির আঙুল ধরল। সারা ঘরজুড়ে তখন শুধু একটা জিনিসই টের পাওয়া যাচ্ছে—চৈতির রাগের আগুন। সে আগুনে আজ ভাত পুড়ছে না, পুড়ছে এই সংসারের বাকি শান্তিটুকুও।
Parent