২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ১৬

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73110-post-6261305.html#pid6261305

🕰️ Posted on Fri Jul 10 2026 by ✍️ Dead people (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1222 words / 5 min read

পর্ব ১৫ (২) বাইরে তখন রাত নেমে এসেছে, শহরের আলো জ্বলছে, কিন্তু তাদের ভেতরে একটা অন্ধকার জমে উঠছে—যেটা কেউ দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু তারা দুজনেই অনুভব করছে। এই অন্ধকারটা হঠাৎ করে আসেনি, এটা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে—ভুল বোঝাবুঝি, না-বলা কথা, আর অর্ধেক সত্যের ভেতর দিয়ে। আর এখন তারা সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সামনে যাওয়ার রাস্তা আছে, কিন্তু সেটা দেখতে পাচ্ছে না। পিছনে ফেরার সুযোগও আছে, কিন্তু সেটা আর সম্ভব না। তারা শুধু দাঁড়িয়ে আছে—একটা অদৃশ্য দূরত্বের দুই পাশে, যেখানে হাত বাড়ালেও ছোঁয়া যায় না। অন্যদিকে; সাইফদের বাড়িতে যেন সময় থেমে গেছে। রুমের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নীরব ছিল, যেন শব্দগুলো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, ভেতরে ঢুকতে পারছে না। সাইফ টেবিলের সামনে বসে, হাতের আঙুলে চিঠিটার কাগজটা চেপে ধরে আছে, যেন একটু ঢিলে হলেই সেটা উড়ে যাবে—বা হয়তো ভেঙে যাবে ভেতরের কিছু। আরিবার হাতের লেখা—একটা সময় এই লেখাগুলো তার কাছে ছিল খুব পরিচিত, প্রায় নিজের মতোই। এখন সেই একই অক্ষরগুলো তার কাছে অপরিচিত না, কিন্তু দূরের—যেন কেউ খুব কাছ থেকে কথা বলছে, অথচ ছোঁয়া যাচ্ছে না। সে বারবার পড়ে, একই লাইন, একই শব্দ—“আমার অভাব দিয়ে কাউকে ভরাইও না…”—এই একটা বাক্য যেন তার মাথার ভেতর প্রতিধ্বনির মতো ঘুরতে থাকে। শব্দগুলো থামে না, বরং প্রতিটা পড়ার সাথে সাথে আরও ভারী হয়ে ওঠে, যেন কাগজের ওপর লেখা না, তার বুকের ভেতরে খোদাই করা। তার চোখে কখনো শিউলির মুখ ভেসে ওঠে—হালকা হাসি, খুব সাধারণভাবে কথা বলা, এমনভাবে পাশে থাকা যেন কোনো দাবি নেই—আবার হঠাৎ সেই মুখের জায়গায় আরিবার সেই চুপচাপ দৃষ্টি এসে দাঁড়ায়। সে বুঝতে পারে, তার ভেতরে দুটো সময় একসাথে বেঁচে আছে—একটা যেটা শেষ হয়ে গেছে, আরেকটা যেটা শুরু হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই দুই সময় একসাথে থাকলে মানুষ টিকে থাকতে পারে না, কারণ একটা সবসময় অন্যটাকে প্রশ্ন করে। তার বুকের ভেতরে একটা টান তৈরি হয়—একদিকে এগোতে চায়, অন্যদিকে পেছনে টানে। সে নিজেকে জিজ্ঞেস করে—“আমি কি সত্যিই শিউলিকে ভালোবাসি?”—কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর কোনো শব্দে আসে না, শুধু একটা অস্বস্তি আসে, একটা অদ্ভুত চুপচাপ কষ্ট। ভালো লাগা তো আছে—শিউলির সাথে থাকলে একটা স্বস্তি আসে, একটা শান্তি—কিন্তু সেই শান্তিটা কি ভালোবাসা, নাকি শুধু ক্লান্তি থেকে পাওয়া বিশ্রাম? সে বোঝার চেষ্টা করে, কিন্তু যত বেশি বোঝার চেষ্টা করে, তত বেশি জড়িয়ে যায়। তার মনে পড়ে—শিউলির সাথে প্রথম কিছু দিন, যখন সবকিছু সহজ ছিল, কোনো প্রশ্ন ছিল না, কোনো অতীত ছিল না, শুধু বর্তমান ছিল। সেই দিনগুলোতে সে নিজেকে হালকা লাগত, যেন সে আবার নতুন করে শুরু করতে পারবে। শিউলি কখনো তাকে চাপ দেয়নি, কখনো কিছু জানতে চায়নি, সে শুধু পাশে ছিল—একটা নরম, উষ্ণ উপস্থিতির মতো। সেই উপস্থিতিটা সাইফকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সে সেটা অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু এখন, যখন সে এই চিঠিটার সামনে বসে আছে, তখন সে বুঝতে পারছে—এই বেঁচে থাকা কি সত্যিই নতুন কিছু, নাকি পুরোনো কষ্টকে ঢেকে রাখার একটা উপায়? সে নিজের ভেতরে খুঁজতে থাকে—শিউলির প্রতি তার টানটা কি শিউলির জন্য, নাকি আরিবার অনুপস্থিতির জন্য? এই প্রশ্নটা যতবার মাথায় আসে, ততবার সে অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নেয়, যেন নিজের কাছ থেকেই পালাতে চায়। কারণ সত্যিটা যদি এমন হয়, যেটা সে শুনতে চায় না? সে কি প্রস্তুত সেটা মেনে নিতে? তার মনে হয়—ভালোবাসা যদি সত্যিই নতুন জায়গা তৈরি করে, তাহলে সে কেন বারবার পুরোনো জায়গায় ফিরে যাচ্ছে? কেন শিউলির সাথে থাকা অবস্থাতেও সে আরিবার কথা ভাবে? এই দ্বন্দ্বটা তাকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়, কিন্তু সে এই ক্লান্তি কাউকে দেখাতে পারে না। বাইরে থেকে সব ঠিক—সে কাজ করছে, কথা বলছে, স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে—কিন্তু ভেতরে একটা টানাপোড়েন চলতেই থাকে। শিউলি এই পরিবর্তনটা খুব ধীরে বুঝতে শুরু করে, এমনভাবে যে প্রথমে সে নিজেই নিশ্চিত হতে পারে না—এটা সত্যিই বদল, নাকি তার নিজের ভেতরের কোনো ভয়। সাইফ আগের মতো কথা বলে না, মাঝেমধ্যে কথার মাঝখানে থেমে যায়, যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেছে, অথবা কিছু ভুলে গেছে। তার চোখে একটা অদ্ভুত দূরত্ব আসে—যেন সে সামনে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আসলে অন্য কোথাও দেখছে। শিউলি প্রথমে এটাকে ক্লান্তি ভেবেছিল, কাজের চাপ ভেবেছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে বুঝতে পারে—এই দূরত্বটা শুধু বাইরের না, এটা ভেতরের। সে লক্ষ্য করে—সাইফ তার কথা শুনছে, কিন্তু আগের মতো প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে না, তার হাসিটা ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না, তার উপস্থিতিটা যেন পুরোপুরি অনুভূত হচ্ছে না। এই ছোট ছোট জিনিসগুলোই ধীরে ধীরে একটা বড় অনুভূতিতে পরিণত হয়—সে যেন কারও জীবনে পুরোটা নেই, শুধু আংশিক আছে। এই আংশিক থাকার অনুভূতিটা খুব কষ্টের, কারণ এখানে কোনো স্পষ্ট অভিযোগ নেই, কিন্তু একটা অদৃশ্য শূন্যতা আছে। সে মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকায়—হাসে, আবার হাসিটা মিলিয়ে যায়—যেন সে বুঝতে চাইছে, কোথায় ভুল হচ্ছে। তার মনে হয়—সে কি যথেষ্ট না? নাকি সে এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার জায়গাটাই আসলে কারও জন্য বানানো না? একটা বিকেলে, আলোটা একটু নরম ছিল, জানালার পর্দা দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল ছায়া-ছায়া হয়ে, তখন শিউলি খুব সাধারণভাবে জিজ্ঞেস করেছিল—“তুমি কি কিছু ভাবতেছ?” প্রশ্নটা এমনভাবে বলা, যেন কোনো চাপ নেই, শুধু একটা জানার ইচ্ছে। সাইফ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল—এই চুপ থাকার ভেতরেই অনেক কিছু ছিল—তারপর বলেছিল, “সবাই কিছু না কিছু ভাবতেছে।” এই উত্তরটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা এড়িয়ে যাওয়া ছিল। শিউলি হালকা হেসেছিল—একটা ছোট, নিয়ন্ত্রিত হাসি—“সবাই না, তুমি।” এই কথাটা খুব নরমভাবে বলা, কিন্তু এটা সরাসরি। এই সরলতা, এই সরাসরি হওয়াটা সাইফকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়, কারণ সে বুঝতে পারে—এই মেয়ে তাকে খুব সহজভাবে দেখে, কিন্তু সেই সহজতার ভেতরে একটা গভীর বোঝাপড়া আছে। সে জানে, সে লুকাতে পারছে না পুরোটা। তার মনে হয়—সে যদি এখন সত্যিটা বলে দেয়, তাহলে কী হবে? সে কি প্রস্তুত সেই কথোপকথনের জন্য? সে কি নিজেই জানে তার সত্যিটা কী? এই প্রশ্নগুলো তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে, আর সে কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। তাই সে চুপ থাকে, আর সেই চুপ থাকাটাই সব বলে দেয়। শিউলি আর কিছু জিজ্ঞেস করে না, কারণ সে বুঝে গেছে—কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর মানুষ তখনই দেয়, যখন সে নিজে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু তার ভেতরে একটা নতুন অনুভূতি জন্ম নেয়—একটা ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা উপলব্ধি—সে হয়তো এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার উপস্থিতি পুরোটা না। সে ভাবতে শুরু করে—সে কি সত্যিই সাইফের জীবনে নিজের একটা জায়গা তৈরি করেছে, নাকি সে শুধু একটা ফাঁকা জায়গা পূরণ করছে? এই ভাবনাটা প্রথমে খুব ছোট ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বড় হতে থাকে। সে বুঝতে পারে—কাউকে ভালোবাসা মানে শুধু তার পাশে থাকা না, বরং তার ভেতরের জায়গাটায় থাকা। আর যদি সেই জায়গাটা আগেই কারও জন্য ভরা থাকে, বা কারও স্মৃতিতে দখল করা থাকে, তাহলে সেখানে নতুন করে জায়গা বানানো খুব কঠিন। তার বুকের ভেতরে একটা হালকা ব্যথা হয়—তীব্র না, কিন্তু স্থায়ী—যেন কেউ খুব আস্তে করে চাপ দিয়ে রেখেছে। রাত নামলে এই অনুভূতিগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাইফ নিজের ভেতরে ডুবে থাকে, শিউলি নিজের ভেতরে। একই ঘরে থেকেও তারা আলাদা আলাদা ভাবনায় ডুবে থাকে। মাঝে মাঝে তাদের চোখে চোখ পড়ে, কিন্তু সেই চোখের ভেতরে আগের মতো উষ্ণতা নেই—বরং একটা প্রশ্ন আছে, একটা দ্বিধা আছে। এই নীরবতা কোনো ঝগড়ার মতো না, এটা আরও গভীর—কারণ এখানে শব্দ নেই, শুধু অনুভূতি আছে। সাইফ চিঠিটা আবার হাতে নেয়, আবার পড়ে—যেন সে কোনো উত্তর খুঁজছে, কোনো নির্দেশনা খুঁজছে—কী করা উচিত, কীভাবে বোঝা উচিত। আর শিউলি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখে—এই মুখটা কি সত্যি? নাকি এটা একটা অভ্যাস? তারা দুজনেই নিজেদের মতো করে লড়ছে—একজন অতীতের সাথে, আরেকজন বর্তমানের সাথে। ধীরে ধীরে একটা সত্য স্পষ্ট হতে শুরু করে—ভালোবাসা কখনো শুধু থাকা না, এটা বোঝা, গ্রহণ করা, আর সত্যের মুখোমুখি হওয়া। সাইফ বুঝতে পারে—সে যদি সত্যিই শিউলির সাথে থাকতে চায়, তাহলে তাকে নিজের ভেতরের এই দ্বন্দ্বটা শেষ করতে হবে, তাকে ঠিক করতে হবে—সে কী অনুভব করছে, কেন অনুভব করছে। আর শিউলি বুঝতে পারে—সে যদি এই সম্পর্কে থাকে, তাহলে তাকে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে দেওয়া যাবে না। এই দুই উপলব্ধির মাঝখানেই তাদের সম্পর্কটা দাঁড়িয়ে আছে—একটা সূক্ষ্ম জায়গায়, যেখানে একটু এগোলেই বদলে যাবে সবকিছু। আর এই বদলটা হঠাৎ করে আসবে না—এটা আসবে ধীরে, নিঃশব্দে, কিন্তু একবার এলে আর আগের জায়গায় ফেরা যাবে না। (চলবে...)