নিষিদ্ধ নগরের পাণ্ডুলিপি (Manuscript of the Forbidden City) - অধ্যায় ১৩

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73118-post-6181901.html#pid6181901

🕰️ Posted on Fri Apr 10 2026 by ✍️ Vritra Shahryar (Profile)

🏷️ Tags:
📖 3024 words / 13 min read

Parent
Chapter 4         ❝ তাসের দেশ ❞        The House of Cards পশ্চিমবঙ্গ আর ওড়িশা বর্ডারের এক গভীর জঙ্গল। চারিদিকে ঘন শাল আর মহুয়ার গাছে ঘেরা এক জনমানবহীন নিস্তব্ধতা। সেই অন্ধকারের বুকে একটা ছোট তাবু পাতা। তাবুর ভেতরে একটা টিমটিমে হারিকেন জ্বলছে, যার হলদেটে আলোয় চারপাশের ছায়াগুলো দেওয়ালে অদ্ভুতভাবে নাচছে। সেই হারিকেনের আলোয় বসে আছেন এক বৃদ্ধ। বয়স অনেক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর চওড়া কাঁধ আর সুঠাম শরীর দেখে বোঝার উপায় নেই যে কালজয়ী কোনো যোদ্ধা নাকি কোনো ঋষি। মুখভর্তি ধবধবে সাদা দাড়ি, গায়ের চামড়া কিছুটা কুঁচকে গেলেও তাঁর উপস্থিতিতে এক অদ্ভুত শান্ত ছায়া আছে। কিন্তু সেই শান্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক প্রলয়ংকরী শক্তি। তাঁর চোখ দুটো ভীষণ শান্ত, কিন্তু মণির ভেতরে হালকা লালচে আভা—যেন ভেতরে এক ধিকধিকি আগুন জ্বলছে। তিনি ফোনের ওপাশে কারোর সাথে কথা বলছেন। তাঁর কণ্ঠস্বর গম্ভীর আর স্থির। "অনেকটা এগিয়ে এসেছে ওরা... আমাদের হাতে একসময় শুধু পাওয়ার থাকত। আমাদের  পবিত্র মাটি, আমাদের 'হলি ল্যান্ড' আজ আবার বিপদে। তাড়াতাড়ি কিছু করতে হবে, নাহলে বিপদ ঘনিয়ে আসছে।" কথাটা শেষ করে তিনি হঠাৎ থামলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ কান দুটো যেন বাইরের বুনো অন্ধকারের কোনো সুক্ষ্ম শব্দ ধরার চেষ্টা করল। তাবুর পর্দা সরিয়ে তিনি সামনের সেই ঘুটঘুটে কালো জঙ্গলের দিকে তাকালেন। তারপর ধীর অথচ বরফের মতো শীতল গলায় বললেন, "এবার ওদের বোঝাতে হবে ওদের ভাষাতেই। শুরু হবে—প্রজেক্ট তাসের দেশ।" তিনি আবার ফোনে মনোযোগ দিলেন। ওপাশ থেকে আসা প্রতিটি শব্দ খুব মন দিয়ে শুনে তিনি খুব ধীর লয়ে উচ্চারণ করলেন: "অতিরিক্ত উঁচুতে তোলা দেয়াল কখনোই বাইরে থেকে ভাঙা যায় না। ইতিহাস এক নিষ্ঠুর সত্যের ফিসফিসানি শোনায়—প্রতিটি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে তার ভেতর থেকেই।" একটু থেমে তিনি আবার বলতে লাগলেন: "Walls built too high cannot be broken from the outside. History whispers a crueler truth—every empire falls from within." তাঁর কণ্ঠস্বর যেন রাতের অন্ধকারের সাথে মিশে যেতে লাগল: "আমরা যাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি তারা শক্তিশালী... এবং এতটাই দয়াহীন যে তারা নিজেদের সীমানা ভুলে গেছে। অহংকারের ওপর ভারসাম্য বজায় রেখে তাসের ওপর তাস সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের এই রাজত্ব। ওরা বিশ্বাস করে এই দেয়ালগুলোই ওদের রক্ষা করবে।" "The ones we face are powerful… and merciless enough to forget their own limits. Their kingdom stands tall, card over card, balanced on arrogance. They believe the walls will protect them." বৃদ্ধের চোখে সেই হালকা লালচে মণির আগুনটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি শেষবারের মতো বিড়বিড় করলেন: "কিন্তু কোনো মজবুত প্রাসাদের ধস কখনো তার সদর দরজা দিয়ে নামে না।এটা শুরু হয় অন্ধকারের ভেতর নড়ে ওঠা একটি মাত্র তাসের কার্ড দিয়ে। ওদের কল্পনাকেও ছাপিয়ে গেছে ওদের অন্তিম সময়।" "But the end of a fortress never begins at the gates. It begins with a single card moving in the dark. The end is closer than they imagine." ফোনের লাইনটা কাটার আগে তিনি শুধু শেষ দুটো শব্দ উচ্চারণ করলেন যা নিস্তব্ধ জঙ্গলকেও যেন কাঁপিয়ে দিল — "Initiate: Project Tasher Desh." রক্তনগরীর উপকণ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকা কাঁচ আর স্টিলের তৈরি এক দানবীয় স্থাপত্য—MSIAME। রোদ পড়লে বিল্ডিংটা এমনভাবে চকচক করে ওঠে যে মনে হয় কোনো বিশাল হীরের টুকরো মাটিতে গেঁথে আছে। অডিটোরিয়ামের মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন ডিন ড. রুদ্রাণী চ্যাটার্জি। পরনে তাঁর গাম্ভীর্যপূর্ণ সিল্কের শাড়ি, চোখে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার ছাপ। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, “Ladies and Gentlemen, please welcome the visionary behind this empire, our very own Managing Director and philanthropist—Dr. Meghaditya Sen!” নামটা শেষ হতে না হতেই অডিটোরিয়ামের নিস্তব্ধতা ভেঙে কয়েকশ জোড়া হাতের তালি আর চিৎকারে কান পাতা দায় হয়ে পড়ল। নতুন আসা ছাত্র-ছাত্রীদের চোখে বিস্ময় আর শ্রদ্ধার মিশেল। তাদের কাছে এই মানুষটা স্রেফ একজন ডাক্তার নন, এক জীবন্ত কিংবদন্তি। মঞ্চের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন মেঘাদিত্য সেন। ধবধবে সাদা ল্যাব কোটের ভেতরে দামী থ্রি-পিস স্যুট, চোখে রূপালি ফ্রেমের চশমা। তিনি মাইক্রোফোনের কাছে আসতেই পুরো হলঘর যেন যাদুকাঠির ছোঁয়ায় একদম শান্ত হয়ে গেল। তিনি হালকা হেসে হলভর্তি তরুণ মুখের দিকে তাকালেন। তারপর ধীর অথচ গভীর কণ্ঠে বললেন, “Good Morning... future doctors and future researchers!” পুরো অডিটোরিয়াম সমস্বরে উত্তর দিল— “Good Morning, Sir!” মেঘাদিত্য একবার মঞ্চের একপাশে বসে থাকা কলেজের ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের দিকে তাকালেন। রুদ্রাণী চ্যাটার্জি, অভিরূপ মুখার্জি আর সঞ্জয় রায়ের চোখে তখন এক গোপন গর্বের ঝিলিক। মেঘাদিত্য আবার হলের দিকে ফিরলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ চোখগুলো যেন প্রতিটা ছাত্রের মাথার ভেতরটা স্ক্যান করে নিচ্ছে। তারপর খুব নিচু কিন্তু কমান্ডিং স্বরে বলতে শুরু করলেন: “মেডিসিন কোনো সেবা নয়... মেডিসিন হলো এক বিবর্তন। আমার এই ইনস্টিটিউটে যারা পা রেখেছো, তারা প্রথমেই ভুলে যাও যে তোমরা মানুষকে বাঁচাতে এসেছো। আমরা এখানে এসেছি প্রকৃতিকে চ্যালেঞ্জ করতে। একজন সাধারণ ডাক্তার আর একজন MSIAME গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে তফাৎ হলো— 'ক্ষুধা' (Hunger)।” একটু থামলেন মেঘাদিত্য। হলের কোণে বসা কয়েকজন ছাত্রের চোখে এক অদ্ভুত উন্মাদনা খেলে গেল। যেন তারা জীবনের পরম সত্যটা আজ খুঁজে পেয়েছে। মেঘাদিত্য আবার বলতে লাগলেন: “আবেগের কোনো জায়গা এখানে নেই। আবেগ মানুষকে দুর্বল করে, আর দুর্বলতা গবেষণাকে কলুষিত করে। আমি চাই তোমরা হও— নিবেদিত, নিষ্ঠুর এবং নিখুঁত (Dedicated, Ruthless, and Perfect)। যারা এই তিনটে শর্ত পূরণ করতে পারবে, তাদের জন্য এক বিশেষ দরজা খুলবে।” এ বছর কয়েকশ নতুন মুখ এই প্রেস্টিজিয়াস কলেজে পা রেখেছে। সবার চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন, কোটি টাকা উপার্জনের নেশা আর জীবনের শীর্ষে পৌঁছানোর তীব্র খিদে। আকাশে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই মেঘলা তৈরি হয়ে নিয়েছিল। চোখে একরাশ নতুন জীবনের স্বপ্ন আর মনে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অদম্য জেদ। বাবা, মা আর ভাই সার্থক তখনও ঘুমের দেশে, সেই নিস্তব্ধতার সুযোগ নিয়েই মেঘলা বেরিয়ে এল তার ৩-বিএইচকে ফ্ল্যাট থেকে। গন্তব্য—শহরের সেই পুরোনো শিব মন্দির। মন্দিরের সিঁড়িতে পা রাখার আগে মেঘলা একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার কালো আনারকলি স্যুটে সকালের মিষ্টি রোদ লেগে যেন এক অদ্ভুত মায়াবী আভা তৈরি হয়েছে—ঠিক যেন ঘরের লক্ষ্মী মেয়ে। সে ধীর পায়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠল। মন্দিরের ঘণ্টাটা বাজিয়ে যখন সে চোখ বন্ধ করে প্রণাম করল, তখন তার মনের ভেতরটা তোলপাড় করছিল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, "আজ আমি এক নতুন জীবন শুরু করছি ঠাকুর। কিন্তু শুরুটাই যে হলো এক পাহাড় প্রমাণ মিথ্যে দিয়ে! মা-বাবাকে মিথ্যে বলেছি... অরুণ যে আমাকে এত বিশ্বাস করে, তাকেও অন্ধকারে রেখেছি। আমি কি ঠিক করছি?" ঠিক সেই সময় মন্দিরের বয়স্ক পুরোহিত মশাই স্নেহের সুরে বলে উঠলেন, “কী হয়েছে রে মা? এত সকালে ঠাকুরের কাছে কী চাইছিস? কোনো দুশ্চিন্তা?” মেঘলা চোখ খুলে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “না না, তেমন কিছু না ঠাকুরমশাই। আসলে... একটা কথা জিজ্ঞেস করব আপনাকে?” পুরুত মশাই হাসিমুখে বললেন, “বল না মা, কী বলবি?” মেঘলা একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কোনোদিন মিথ্যে বলে রিগ্রেট (Regret) করেছেন? মানে... পরে কি খুব অনুশোচনা হয়?” পুরুত মশাই একটু ভেবে বললেন, “মিথ্যে তো আমি খুব একটা বলিনি মা। তবে একটা কথা বলি—যে মিথ্যে যদি কারও ভালো করে, কারও স্বপ্ন পূরণ করে, তবে সেই মিথ্যে নিয়ে খুব একটা রিগ্রেট করার প্রয়োজন নেই। উদ্দেশ্য সৎ থাকলেই হলো।” পুরোহিতের কথা শুনে মেঘলার চোখের সামনে এক নিমেষে ভেসে উঠল সেই রুপোলি বাইন্ডিং করা এগ্রিমেন্ট ফাইলটা। চেয়ারম্যান ব্রিজেশ সিংহ রায়ের দেওয়া সেই টাইট স্কার্ট আর স্টকিংসের ড্রেসটা যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকল। মেঘলা একটু শান্ত হয়ে বলল, “অনেক ধন্যবাদ পুরুত মশাই। আমি একটা মিথ্যে বলেছি ঠিকই, কিন্তু এই মিথ্যে না বললে আমার এই নতুন কর্পোরেট লাইফটা হয়তো কোনোদিনই শুরু হতো না।” পুরুত মশাই আশীর্বাদ করে বললেন, “ভালো থাক মা। তোর যাত্রা শুভ হোক।” মনটা কিছুটা হালকা করে মেঘলা যখন বাড়ি ফিরল, দেখল ড্রয়িংরুমে সোফায় এলিয়ে বসে ল্যাপটপে কাজ করছেন ডঃ সায়ক সিনহা। সায়ক মাথা তুলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে একগাল হাসলেন। “বাহ্‌! আমার মেয়েটাকে তো আজ একদম ঘরের লক্ষ্মী প্রতিমা লাগছে রে!” সায়কের গলায় এক অদ্ভুত গর্ব। মেঘলা ম্লান হেসে বলল, “হ্যাঁ বাবা, সকালে একটু মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিলাম। এই তো, একটু পরেই অফিসের জন্য বেরিয়ে যাব।” সায়ক ল্যাপটপটা বন্ধ করে হাসিমুখে বললেন, “আজ তোর প্রথম দিন। যা, চটপট রেডি হয়ে আয়। আজ আমি নিজেই তোকে অফিসে ছেড়ে দিয়ে আসব।” মেঘলার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। বাবা ওকে এসআরসি টাওয়ার্সে নামিয়ে দিয়ে আসবে? নিজের ঘরে ঢুকেই মেঘলা দরজাটা হালকা করে ভিজিয়ে দিল। খাটের ওপর পড়ে থাকা সেই গ্রে মিনি স্কার্ট আর ব্ল্যাক স্টকিংসগুলোর দিকে সে একবার তাকাল। পোশাকগুলোর মসৃণ টেক্সচার তাকে একটু লজ্জায় ফেলে দিলো, এই মুহূর্তে ওগুলো পরে বাবার সামনে যাওয়ার সাহস তার নেই। সে দ্রুত হাতে পোশাকগুলো ভাঁজ করে ব্যাগের একদম নিচের দিকে ঢুকিয়ে দিল। তার ওপর রাখল সেই রুপোলি বাইন্ডিং করা এগ্রিমেন্ট ফাইলটা। সেখানে এখনও মেঘলা সিনহা নামটা সই করা হয়নি—সেই কাজটা তোলা আছে ২০ তলার সেই কাঁচের চেম্বারের জন্য। নিজের আলমারি থেকে একটা সাধারণ সুতির শাড়ি বের করে পরে নিল মেঘলা। আয়নায় নিজেকে দেখে তার মনে হলো, এটাই সবথেকে নিরাপদ। সে কাউকে বুঝতে দেবে না তার ব্যাগের ভেতর কোন আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে। হঠাৎ অরুণের কথা মনে পড়ল তার। মেঘলা ফোনটা হাতে নিয়ে দ্রুত ডায়াল করল। ওপাশ থেকে অরুণের ঘুম জড়ানো গলা আসতেই মেঘলা নিচু স্বরে বলল, "অরুণ, আমি বেরোচ্ছি। শোনো, আজ সারাদিন আমাকে ফোনে পাবে না। আমি ফোনটা ঘরেই রেখে যাচ্ছি... নতুন অফিসে গিয়েই ফোনে বিজি থাকাটা ঠিক দেখাবে না। আমি ফিরে এসে তোমাকে ফোন করব, ওকে?" অরুণ কিছু বলার আগেই মেঘলা ফোনটা বিছানায় রেখে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় কড়া নাড়লেন সায়ক সিনহা। "কিরে মেঘলা? তাড়াতাড়ি আয়... রেডি হয়ে নে। দেরি হয়ে গেলে কিন্তু প্রথম দিনেই ইম্প্রেশন খারাপ হবে। আমি গাড়িতে স্টার্ট দিচ্ছি, তুই জলদি নাম।" সায়কের গলার স্বরে এক অদ্ভুত তাড়া আর উৎসাহ। মেঘলা ব্যাগের চেইনটা ভালো করে টেনে নিল। আয়নায় শেষবার নিজের চোখের দিকে তাকাল সে। নিজের প্রতিচ্ছবিকে যেন নিজেই চিনতে পারছে না। ফোনের স্ক্রিনটা নিভে যেতেই ঘরের আলোটাও যেন একটু ফিকে হয়ে এল। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে মেঘলা ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিরব। মনে মনে ভাবল, "উফ! আজ যদি অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়, তবে বাবার কাছে এ কদিন যেটুকু বাহবা পেয়েছি, সব নিমেষেই ধুলোয় মিশে যাবে।" বিছানার ওপর পরিপাটি করে রাখা তার প্যান্ট, দামী স্যুট, টাই আর ব্লেজার। পাশে রাখা দামী ঘড়ি আর ফোন। নিরব একবার জানলার ওপাশে ব্যালকনির দিকে তাকাল। সেখানে মখমলি নাইটগাউন পরে বসে আছে অনুশ্রী। তার কোলের ওপর রাখা সেই জার্মান বইটি— ডঃ সায়ক সিনহার দেওয়া সেই বই। বইটির শিরোনাম যেন এক নিষিদ্ধ জগতের হাতছানি: "Das Protokoll der ehelichen Hölle (বিবাহিত নরকের প্রোটোকল)" এবং তার নিচে ছোট করে লেখা— "Geheime Scham- und Demütigungsübungen zur vollständigen Zerstörung der Onanie" (হস্তমৈথুন ধ্বংসের গোপন লজ্জা ও অপমানের প্রোটোকল)। অনুশ্রী অত্যন্ত নিবিষ্ট মনে বইটির পাতায় ডুবে আছে। নিরব নিজের প্যান্ট আর শার্ট পরতে পরতে একটু রসিকতার সুরে বলল, "কী অনু? বইটা পড়ে খুব ভালো লাগছে বুঝি? করতে চাও নাকি ওসব... এখনই?" অনুশ্রী চমকে উঠে বইটা বন্ধ করল। তারপর কামিজের ওপর দিয়ে নিজের শরীরটাকে একটু এলিয়ে দিয়ে ঘরের ভেতর এল। মুখে একটা ম্লান হাসি নিয়ে বলল, "হুম নিরব, করতে চাই। চলো, এখনই করি?" নিরব একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। "আরে আমি তো মজা করছিলাম অনু! আমাকে এখনই অফিসে বেরোতে হবে। বাবা ব্রিজেশ স্যার ওয়েট করছেন।" অনুশ্রী মুচকি হেসে নিরবের টাইটা এগিয়ে এসে ঠিক করে দিতে দিতে বলল, "রিল্যাক্স নিরব... আই নো ইউ হ্যাভ টু গো। ইমপ্রুভমেন্ট হচ্ছে, তাই না? টাই বাঁধাটা শিখতে পেরেছ দেখছি।" কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখটা একটু ভার হয়ে গেল। হাতের বইটি বিছানায় একরকম ছুড়েই ফেলে দিল সে। বিছানায় বসে একটু অভিমানের সুরে বলল, "পাপা কেন তোমাকে এত দূরে পাঠাচ্ছে বলো তো?" নিরব এবার বুঝতে পারল তার মিষ্টি স্ত্রীর মুড সকাল থেকে কেন অফ। সে কাছে এসে অনুশ্রীর কাঁধে হাত রেখে বলল, "ওহ! এই ব্যাপার? দেখো অনু, বাবা আমাকে পুরো প্রজেক্টটা হ্যান্ডেল করতে বলেছে। অহিরাজপুরের ওই লোকাল ট্রাইবালদের সাথে কথা বলে সবটা আমাকেই দেখতে হবে। আর সাথে তো আন্টি, মানে তোমার মা-ও থাকছেন। আলোয়ন ফাউন্ডেশনের নাম  থাকলে আমাদের কাজ আরো সোজা হবে।" অনুশ্রী আবার সেই অদ্ভুত বইটি হাতে তুলে নিল। একটু বিষণ্ণ গলায় বলল, "হুম...!" নিরব অনুশ্রীর পাশে বসে তার গালে একটা আদুরে চুমু খেয়ে বলল, "একদম চিন্তা করো না সোনা। আমি ওখানে গিয়ে অন্য কারো সাথে প্রেম করতে বসব না, প্রমিস!" অনুশ্রী তীক্ষ্ণ চোখে নিরবের দিকে তাকিয়ে বলল, "কেন? তুমি কি প্রেম করতে চাও নাকি অন্য কারো সাথে?" নিরব হো হো করে হেসে উঠল। "আরে না না! জাস্ট মজা করছিলাম। আচ্ছা এবার আসি, বাইরে আলম দাঁড়িয়ে আছে। দেরি হলে তোমার শ্বশুরমশাই ব্রিজেশ সিংহ রায় জ্যান্ত পুঁতে ফেলবেন আমাকে!" 'আলম'-এর নামটা শুনতেই অনুশ্রীর চোখের মণিটা যেন একটু কেঁপে উঠল। সে নিরবের চোখের দিক থেকে নজর সরিয়ে তার হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। অনুশ্রীর এই আচমকা নীরবতা নিরব খেয়াল করল না। সে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘরটা আবার সেই ভারী নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। নিরব চলে যাওয়ার পর অনুশ্রী যেন একলা এক দ্বীপে বন্দি।  কোলের ওপর রাখা সেই ডঃ সায়ক সিনহার দেওয়া জার্মান বইটার পাতাগুলো সে আবার ওল্টাতে লাগল। বইয়ের ভেতরে লেখা সেই 'লজ্জার ব্যায়াম' আর 'অপমানের প্রোটোকল'গুলো যেন রক্তমাংসের রূপ ধরে তার মাথায় রাজত্ব করতে শুরু করেছে। ঘরের এসির হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যেও অনুশ্রীর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। সে বুঝতে পারছে, এই বইয়ের শব্দগুলো তাকে এক  আদিম জগতের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে—যেখানে লজ্জা আর আনন্দ মিলেমিশে একাকার। হঠাৎ অজানতেই তার মনে পড়ে গেল নিরবের ড্রাইভার 'আলম'-এর কথা।অনুশ্রী নিজের ফর্সা, নরম হাতের তালুটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে, যেন এক ঘোরগ্রস্ত অবস্থায়, নিজের হাতটা নাকের কাছে টেনে আনল সে। চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘ শ্বাস নিল। কিন্তু পরক্ষণেই সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল, "উফ! নেই... সেই গন্ধটা নেই!" সে হন্যে হয়ে নিজের হাতের ঘ্রাণ নিতে লাগল,  সেই যেনো নোনা, ভ্যাপসা, উগ্র আর বুনো পুরুষালি ঘাম আর থুথু মিশ্রিত সেই আদিম গন্ধটা আজ তার এই পরিষ্কার হাত থেকে উধাও। অনুশ্রীর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনটার কথা—যেদিন আলম তার হাত থেকে টাকা নেওয়ার সময় ইচ্ছে করেই হোক বা অনিচ্ছায়, তার হাতের তালুতে একটা চটচটে, একটু গাঢ় পদার্থ লাগিয়ে দিয়েছিল। সেই স্পর্শ আর সেই তীব্র বুনো গন্ধে সেদিন অনুশ্রীর পুরো শরীরের লোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল। এক অদ্ভুত ঘৃণা আর শিহরণে সে কুঁকড়ে গিয়েছিল। আজ সেই তীব্রতাটা না পেয়ে অনুশ্রী হঠাৎ ছটফট করে চটজলদি চোখ খুলে ফেলল। নিজের এই অবস্থার ওপর নিজেরই ঘেন্না হলো তার। সে এক ঝটকায় বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। "না! আমাকে এখনই বেরোতে হবে। এভাবে ঘরে বসে থাকলে এই বই আমার মাথাটা পাগল করে দেবে। আই নিড টু ডাইভার্ট মাই মাইন্ড!" "ফোকাসড! ফোকাসড মেঘলা!"—নিজের মনের ভেতর বারবার শব্দটা আউড়াচ্ছে মেঘলা। মিনিট পাঁচেক আগেই বাবা তাকে অফিসের গেটে নামিয়ে দিয়ে গেছে। গাড়ির ভেতর বাবার পাশে বসে থাকার সময় তার বুকটা যেভাবে ঢিপঢিপ করছিল, এখন তার তীব্রতা যেন শতগুণ বেড়ে গেছে। এসআরসি টাওয়ার্সের গ্রাউন্ড ফ্লোরের আলিশান ওয়াশরুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটা লক করে দিল সে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শাড়ি পরা শান্ত রূপটার দিকে শেষবার তাকাল। তারপর ব্যাগ থেকে বের করল সেই 'নিষিদ্ধ' পোশাকগুলো—ধবধবে সাদা টাইট শার্ট, গ্রে রঙের ছোট মিনি স্কার্ট, কালো ব্লেজার আর সেই ব্ল্যাক ফিশনেট স্টকিংস। মেঘলা নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিল, "জাস্ট একটা বছর মেঘলা। তুই তো কোনো পাপ করছিস না, স্রেফ জব করছিস। আর এই হাই-প্রোফাইল কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে টিকে থাকতে গেলে ওদের কন্ডিশন তো মানতেই হবে।" সে দ্রুত হাতের শাড়িটা খুলে ফেলল। শ্বেতশুভ্র ফর্সা শরীরের ওপর সাদা অন্তর্বাসগুলো যেন তার শেষ আবরণ হয়ে টিকে রইল। হাত চালিয়ে সে নতুন পোশাকগুলো পরে নিল। আয়নায় নিজেকে দেখে সে নিজেই চমকে উঠল—এ যেন অন্য এক মেঘলা। শাড়ি পরা সেই লক্ষ্মী মেয়েটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। লম্বা চুলে আঙুল চালিয়ে সেটা এলিয়ে দিল পিঠের ওপর, পায়ে গলিয়ে নিল উঁচু হিল। ওয়াশরুম থেকে বেরোনোর সময় তার প্রতিটা পদক্ষেপ এখন আত্মবিশ্বাসে টগবগ করছে। রিসেপশনে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারল—চেয়ারম্যান স্যার চলে এসেছেন। মেঘলা দ্রুত লিফটে উঠে সরাসরি ২০ তলায় পৌঁছাল। লম্বা গ্লাস-করিডোর পার হওয়ার সময় তার হিলের শব্দ পুরো ফ্লোরে প্রতিধ্বনি তুলছে। সে বুকভরা সাহস নিয়ে সেই বিশালাকার কাঁচের কেবিনের দরজাটা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিল। "স্যার... আসব?" ব্রিজেশ সিংহ রায় যেন ঠিক এই মুহূর্তটার জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। মেঘলার এই নতুন অবতার দেখে তার চোখের মণি চকচক করে উঠল। "এসো মেঘলা... এসো, বসো।"—ব্রিজেশ হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাল ঠিকই, কিন্তু টেবিলের নিচে তার হাত দুটো অবাধ্য হয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে সে প্যান্টের ওপর দিয়েই নিজের উত্তেজনা সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। তার চাউনি মেঘলার শরীরের বাঁকে বাঁকে বিষাক্ত সাপের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। মেঘলা ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ব্রিজেশের মুখোমুখি চেয়ারটা তে বসল। ব্রিজেশ সিংহ রায়ের সামনে বসলে যে কেউ ভয়ে কুঁকড়ে যায়। লোকটার ব্যক্তিত্বে এমন এক ভারিক্কি দাপট আছে যা প্রতিপক্ষকে নিস্তব্ধ করে দেয়। মেঘলা চেয়ারে বসে এক অদ্ভুত অস্বস্তি অনুভব করছিল। সাদা শার্টটা এতটাই টাইট যে মনে হচ্ছে তার শরীরটাকে কেউ আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। সে একবার আড়চোখে নিজের কোলের দিকে তাকাল—এই ড্রেসে নিজেকে তার নিজের চোখেই বড় অচেনা আর নগ্ন মনে হচ্ছে। ব্রিজেশ তার দামী বিদেশি সিগারেটের শেষ অংশটা অ্যাশট্রেতে ঘষে নিভিয়ে দিল। হালকা নীলচে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে কেবিনের এসি-র বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। ব্রিজেশ তার অভিজ্ঞ, তীক্ষ্ণ চোখে একবার মেঘলাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত মেপে নিল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, "মেঘলা, আই অ্যাম ভেরি গ্ল্যাড দ্যাট ইউ রিয়েলি ওয়ান্ট টু স্টার্ট ইওর ক্যারিয়ার উইথ আস... সিংহ রায় কনগ্লোমারেট।" বলতে বলতে সে লক্ষ্য করল মেঘলা লজ্জায় আর অস্বস্তিতে নড়াচড়া করছে। ব্রিজেশ হাসল, তবে সেই হাসিতে কোনো ওম ছিল না। "মেঘলা, বি কমফর্টেবল। এখানে কেউ তোমাকে মেরে ফেলবে না। রিল্যাক্স! আর ব্লেজার পরে যখন বসবে, তখন সবসময় বোতাম খুলে বসবে। মনে হচ্ছে তুমি ফার্স্ট টাইম পরলে?" মেঘলা নিচু স্বরে উত্তর দিল, "ইয়েস স্যার।" "ওকে, আনবাটন ইওর ব্লেজার।"—ব্রিজেশের কণ্ঠস্বর এখন আদেশের মতো শোনাল। মেঘলা কাঁপা হাতে ব্লেজারের বোতামটা খুলতেই ভেতরকার সাদা শার্টটা যেন আরও বেশি করে উপচে পড়ল। তার বুক দুটো টাইট হয়ে এমনভাবে আছে যে মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে শার্টের বোতাম ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। ব্রিজেশের চোখে তখন কামাতুর লোভের ঝিলিক। সে খুব সাবধানে বলল, "সরি মেঘলা, আসলে তোমার সাইজ তো কেউ জানত না। এটা একটা ডেমো ড্রেস। তুমি আগামীকাল কোম্পানিতে নিজের সাইজ লিখে দেবে, নাহলে ওরা মেপে নেবে। তোমার ড্রেস স্পেশালি অফিস থেকেই তৈরি হবে।" 'সাইজ' শব্দটা শুনে মেঘলার কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল লজ্জায়। ব্রিজেশ আবার বলল, "শার্টের ওপরের দিক থেকে একটা বোতাম খুলে নাও মেঘলা, নাহলে ওটা ছিঁড়ে যাবে।" মেঘলা আর কোনো কথা না বলে ওপরের বোতামটা খুলতেই যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু এখন তার গলার নিচে চাপা দুধ দুটোর খাঁজ সাদা শার্টের আড়াল থেকে স্পষ্ট উঁকি দিচ্ছে।  ব্রিজেশ তৃপ্তির হাসি হেসে বলল, "নাউ ইউ আর কমফর্টেবল।" মেঘলা একটু সৌজন্যের হাসি হাসল, যার মধ্যে আত্মবিশ্বাস আর লজ্জা মিলেমিশে একাকার। ব্রিজেশ এবার এগ্রিমেন্টের এক কপি টেবিলের ওপর এগিয়ে দিয়ে বলল, "আই হোপ তুমি সব রুল আর কন্ডিশন ভালো করে পড়েছ?" "ইয়েস স্যার। আমি সব টার্মস পড়েছি। আই থিঙ্ক আই অ্যাম রেডি টু সাইন দিস।"—মেঘলা বলল। ব্রিজেশ একটা কুটিল হাসি দিল। "ইটস গুড দ্যাট ইউ আর সাচ অ্যান এনথুসিয়াস্টিক গার্ল। আমরা তোমাকে এই পজিশনেই চাইছিলাম। কিন্তু মেঘলা, আমি চাই তুমি আরও একটু সময় নাও। এটা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আরেকবার পড়ো, বোঝো। আপাতত আমি চাইছি তুমি উইদাউট এগ্রিমেন্টই জবটা কন্টিনিউ করো।" মেঘলা কৃতজ্ঞতার সাথে হাসল, "থ্যাঙ্ক ইউ স্যার! আপনি যা বলবেন তাই হবে।" ব্রিজেশ হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "ওয়েলকাম মিস মেঘলা সিনহা। ইউ আর অ্যাপয়েন্টেড অ্যাজ EPS—এক্সিকিউটিভ পার্সোনাল সেক্রেটারি।" বাইরে বেরোতেই মেঘলা দেখল ব্রিজেশের কেবিনের ঠিক পাশেই আর একটা কাঁচের কিউবিকল, যেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা— 'মেঘলা সিনহা: ই-পি-এস'। নিজের কেবিনে ঢুকে মেঘলা অবাক হয়ে গেল। শৌখিন টেবিল, রিভলভিং চেয়ার আর দামী আসবাব। এই আভিজাত্যের জন্যই তো সবাই এই পজিশনের স্বপ্ন দেখে! ব্রিজেশ দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, "মেঘলা, যদিও তুমি আমার কেবিনে এই বেশি থাকবে, তাও এটা তোমার ওয়ার্ক প্লেস। আমার মাঝে মাঝে একা থাকতে ভালো লাগে। আজকের যা যা মিটিং আর পেন্ডিং কাজ আছে, সবটা একবার দেখে নাও।" ব্রিজেশ চলে যেতেই মেঘলা নিজের রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। মুখে এক জয়ের হাসি,অনেকদিন পর তার মুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তির ছায়া। (Chapter 4 - Continued....)
Parent