দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - অধ্যায় ১৯

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74058-post-6250821.html#pid6250821

🕰️ Posted on Mon Jun 29 2026 by ✍️ Orbachin (Profile)

🏷️ Tags: None
📖 3379 words / 15 min read

১৯। আমরা দুজন বিছানা থেকে নামলাম। একটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম। আমরা কেউই কাপড় পরার কোনো প্রয়োজন বোধ করলাম না। লজ্জা বা সংকোচের যে পর্দাটা ছিল, সেটা বাথটাবের পানিতে আর এই বিছানার চাদরে পুরোপুরি ধুয়ে মুছে গেছে। আমি আর আনিকা, সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় বেডরুম থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে কিচেনের দিকে এগোতে লাগলাম। দৃশ্যটা পরাবাস্তব। ধানমন্ডির একটা অত্যাধুনিক, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। সেন্ট্রাল এসি চলছে। ফ্লোরে দামি উডেন টাইলস। আর সেই ফ্ল্যাটের ভেতর দিয়ে সম্পূর্ণ আদিম যুগের মানব-মানবীর মতো আমরা দুজন হেঁটে যাচ্ছি। কিচেনে ঢুকে আমি লাইট জ্বালালাম। বিশাল মডুলার কিচেন। আমি ক্যাবিনেট ঘেঁটে চার প্যাকেট নুডলস, কয়েকটা পেঁয়াজ আর কাঁচামরিচ বের করলাম। "আপনি বসুন আনিকা। আমি বানাচ্ছি," আমি একটা ছুরি নিয়ে পেঁয়াজ কাটতে শুরু করলাম। আনিকা কিচেন আইল্যান্ডের মার্বেল টপের ওপর লাফ দিয়ে উঠে বসলেন। উনার দুই হাত দুই পাশে ভর দেওয়া। পা দুটো নিচে ঝুলছে।আমি পেঁয়াজ কুচি করছি, আর আড়চোখে উনার দিকে তাকাচ্ছি। কিচেনের উজ্জ্বল সাদা আলোয় উনার শরীরটা এখন কোনো রহস্যময় ছায়ায় ঢাকা নেই। সবকিছু স্পষ্ট। উনার ফর্সা, মসৃণ ত্বক, উনার ভরাট, উদ্ধত স্তনযুগল, উনার সমতল পেট— সবকিছু মিলে আমাকে যেন আবার পাগল করে দিচ্ছে। "রাশেদ, তুমি কি সত্যিই ভালো নুডলস বানাতে পারো?" আনিকা উনার পা দুটো একটু দুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। "ব্যাচেলরদের প্রধান এবং একমাত্র টিকে থাকার অস্ত্রই হলো নুডলস আনিকা। আমরা নুডলস দিয়ে বিরিয়ানির স্বাদ আনতে পারি," আমি হাসিমুখে বললাম। কিন্তু আমার হাসিটা বেশিক্ষণ টিকল না। আনিকা হঠাৎ করে উনার কিচেন আইল্যান্ডে বসা অবস্থাতেই উনার পা দুটো একটু বেশি ফাঁক করে দিলেন। আমি পেঁয়াজ কাটতে কাটতে হঠাৎ থমকে গেলাম। আমার চোখ আপনাআপনি উনার দুই পায়ের মাঝখানের সেই গোপন, রহস্যময় উপত্যকার দিকে চলে গেল। একটু আগে যেখানে আমার জিভ তার সমস্ত তৃষ্ণা মিটিয়েছে, সেই জায়গাটা এখন কিচেনের আলোয় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। আমি ঢোঁক গিললাম। "আনিকা... কী করছেন?" আনিকা খুব নিরীহ মুখে একটা মিষ্টি হাসি দিলেন। "কিছু না তো। আমি দেখছি তুমি কীভাবে পেঁয়াজ কাটো।" কিন্তু উনি শুধু দেখছিলেন না। উনার ডান হাতটা খুব ধীর গতিতে নেমে এল উনার নিজের শরীরের সেই উন্মুক্ত কেন্দ্রের দিকে। নারীরা তাদের ক্ষমতার জায়গাটা খুব ভালো করে জানে। তারা জানে একজন পুরুষকে কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে একটা লালা-ঝরা কুকুরে পরিণত করা যায়। আনিকা উনার আঙুলগুলো দিয়ে উনার নিজের মধুভাণ্ডারের বাইরের নরম পাপড়িগুলোতে খুব আলতো করে স্পর্শ করতে শুরু করলেন। উনার চোখ কিন্তু আমার চোখের সাথে লক করা। উনার ঠোঁটে সেই দুষ্টু, আবেদনময়ী হাসি। আমার হাতের ছুরি থেমে গেছে। আমি বোকার মতো তাকিয়ে আছি। "আনিকা... প্লিজ... আমি কিন্তু পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে আঙুল কেটে ফেলব," আমি কোনোরকমে শব্দগুলো উচ্চারণ করলাম। আমার গলা শুকিয়ে গেছে। উনি শুনলেন না। উনার আঙুলগুলো এখন একটু ভেতরে প্রবেশ করছে। উনি উনার নিজের শরীরকে নিজেই আদর করছেন, আর আমাকে সেটা দেখাচ্ছেন। উনার শ্বাস-প্রশ্বাস একটু ভারী হয়ে আসছে। উনার চোখ দুটো আধবোজা হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হলো আমার মাথার ভেতর কেউ একটা ডিনামাইট ফাটিয়ে দিয়েছে। একটু আগের সেই নিস্তেজ হয়ে যাওয়া শরীরটা আবার নতুন করে ফুঁসে উঠতে শুরু করল। আমার পুরুষাঙ্গটি আবার মাথা তুলে দাঁড়াল। "রাশেদ..." আনিকা উনার আঙুল চালাতে চালাতেই ফিসফিস করে ডাকলেন। "দেখো... আমার আবার ইচ্ছা করছে।" "আনিকা, আপনি কিন্তু আগুন নিয়ে খেলছেন। চুলার পানি এখনো ফুটতে শুরু করেনি, কিন্তু আমার ভেতরের পানি ফুটে যাচ্ছে। আমি যদি এখন রান্না ফেলে আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি, তাহলে কিন্তু সারা রাত না খেয়ে থাকতে হবে," আমি প্রায় ধমকের সুরে বললাম, যদিও আমার ধমকটা আমার নিজের কানেই খুব দুর্বল শোনাল। আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। উনি উনার হাতটা সরিয়ে নিলেন। "ওকে বাবা, ওকে! আগে পেট পূজা, তারপর অন্য কিছু। তুমি রান্না করো। আমি আর ডিস্টার্ব করব না।" কিন্তু উনি ডিস্টার্ব করা থামালেন না। কিছুক্ষণ পর উনি কিচেন আইল্যান্ড থেকে নেমে আমার পেছনে এসে দাঁড়ালেন। উনার নরম, নগ্ন শরীরটা আমার পিঠের সাথে লেপ্টে গেল। উনার দুই হাত আমার কোমর জড়িয়ে ধরল। আমি চুলায় নুডলসের মশলা দিচ্ছি, আর উনি পেছন থেকে উনার মুখটা আমার ঘাড়ে ঘষছেন। উনার বক্ষদেশ আমার পিঠে ক্রমাগত একটা অদ্ভুত শিহরণ তৈরি করছে। "খুব সুন্দর গন্ধ বেরিয়েছে তো," আনিকা আমার পিঠে একটা চুমু খেয়ে বললেন। "গন্ধটা নুডলসের না আনিকা, গন্ধটা আপনার গায়ের," আমি চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে বললাম। নুডলস রান্না শেষ হলো। আমি দুটো প্লেটে সমান করে ভাগ করলাম। গরম ধোঁয়া উঠছে। "চলুন, খাওয়ার আগে আরেকবার শাওয়ার নিয়ে নিই," আনিকা বললেন। "রান্নাঘরের পেঁয়াজ-রসুনের একটা গন্ধ গায়ে লেগে গেছে। আর বিছানার ঘামটাও তো ধোয়া দরকার।" "ঠিক আছে, চলুন।" আমরা আবার বাথরুমে ঢুকলাম। তবে এই শাওয়ারটা প্রথম শাওয়ারের মতো বন্য বা আদিম ছিল না। এটা ছিল চরম ভালোবাসার, অদ্ভুত মায়ায় মাখানো একটা স্নান। আমরা রেইন-শাওয়ারের নিচে পাশাপাশি দাঁড়ালাম। আমি উনার চুলে শ্যাম্পু মাখিয়ে দিলাম। খুব সাবধানে, পরম আদরে আমি উনার পিঠ ঘষে দিলাম। আনিকাও সাবান মেখে আমার বুক, আমার পিঠ ধুয়ে দিলেন। আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছিলাম। কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। শুধু এক ধরনের শান্ত, পবিত্র নির্ভরতা। পানি দিয়ে যখন আমাদের শরীর ধুয়ে গেল, তখন মনে হলো আমরা যেন সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত পাপবোধ, আর সমস্ত পার্থিব হিসাব-নিকাশ ধুয়ে ফেলেছি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আমরা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছলাম। "এবার আপনার গাউন পরার পালা," আনিকা হাসিমুখে বললেন। উনি আলমারি থেকে উনার একটা সিল্কের স্লিপিং গাউন বের করে পরলেন। গাউনটা মেরুন রঙের, উনার ফর্সা ত্বকের সাথে দারুণ মানিয়েছে। আর আমাকে দিলেন বেলাল সাহেবের সেই গাঢ় নীল রঙের গাউনটা। আমরা ডাইনিং টেবিলে মুখোমুখি বসলাম। মাঝখানে ধোঁয়া ওঠা ম্যাগি নুডলস। পৃথিবীর সেরা শেফ যদি এখন আমাকে ক্যাভিয়ার বা স্টেক এনে দিত, আমি হয়তো ছুঁড়ে ফেলে দিতাম। রাত আড়াইটার সময়, একজন অপরূপা নারীর সাথে বসে, ভালোবাসার স্নান সেরে এই যে ম্যাগি নুডলস খাওয়া— এর চেয়ে সুস্বাদু খাবার পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না। আমরা খুব তৃপ্তি নিয়ে, কাঁটাচামচ দিয়ে নুডলস খেলাম। আনিকা ঝালের কারণে একটু ‘শিস শিস’ শব্দ করছিলেন, আর আমি উনার সেই ভঙ্গিটা উপভোগ করছিলাম। খাওয়া শেষ করে আমরা ড্রয়িংরুমের সোফায় গিয়ে বসলাম। আমি পকেট থেকে আমার বেনসনের প্যাকেটটা বের করলাম। "আমি একটা সিগারেট খাব আনিকা। আপনি মাইন্ড করবেন?" "অফকোর্স নট। দাও, আমাকেও একটা দাও।" আমি অবাক হলাম। "আপনি সিগারেট খান?" "মাঝে মাঝে। খুব স্ট্রেস থাকলে বা খুব রিল্যাক্সড মুডে থাকলে। আজকে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে রিল্যাক্সড মুডে আছি।" আমি দুটো সিগারেট ধরালাম। একটা উনার হাতে দিলাম। আমরা দুজন ড্রয়িংরুমের বিশাল সোফায়, আধো অন্ধকারে বসে পাশাপাশি সিগারেট টানতে লাগলাম। সিগারেটের ধোঁয়াগুলো বাতাসে রিং তৈরি করে মিলিয়ে যাচ্ছে। কেউ কোনো কথা বলছি না। এই নীরবতার একটা আলাদা ভাষা আছে। আমরা দুজনেই জানি, আজ রাতের এই ঘটনা আমাদের দুজনের জীবনকেই একটা নতুন, অচেনা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সিগারেট শেষ করে আমি ছাইদানিতে বাটটা গুঁজে দিলাম। "অনেক রাত হলো আনিকা। এবার তো ঘুমানো দরকার," আমি উঠে দাঁড়ালাম। "হুম," আনিকাও উঠে দাঁড়ালেন। আমি আমার নীল স্লিপিং গাউনের বেল্টটা একটু টেনে বেঁধে বললাম, "আমি তাহলে আমার গেস্ট রুমে যাচ্ছি। গুড নাইট।" আমি গেস্টরুমের দিকে মাত্র এক পা বাড়িয়েছি, হঠাৎ আনিকা পেছন থেকে আমার হাতটা ধরলেন। উনার হাতের স্পর্শে আমি থমকে দাঁড়ালাম। ঘাড় ঘুরিয়ে উনার দিকে তাকালাম। আনিকার চোখে এখন একটা গভীর মায়া। একটা অদ্ভুত নির্ভরতা। উনি খুব মৃদু , শান্ত গলায় বললেন—"গেস্ট রুম না রাশেদ। আজ থেকে আমার রুমে আসো।" আমি স্তব্ধ হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। 'আমার রুমে আসো।' এই কথাটা শুধু একটা ফিজিক্যাল ইনভিটেশন নয়। এটা একটা ইমোশনাল একসেপ্টেন্স। একজন নারী যখন একজন পুরুষকে তার নিজস্ব, ব্যক্তিগত বিছানায় সারারাতের জন্য জায়গা দেয়, তখন সে আসলে তার পুরো অস্তিত্বটাকেই সেই পুরুষের হাতে সঁপে দেয়। আমি কোনো কথা না বলে উনার হাতটা আমার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরলাম। আমরা দুজন হেঁটে উনার মাস্টার বেডরুমে ঢুকলাম। সেই বিশাল কিং-সাইজ বিছানা। যে বিছানায় একটু আগে আমরা একটা প্রলয়ঙ্করী ঝড় তুলেছিলাম, সেটা এখন আবার শান্ত হয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।আমরা বিছানায় উঠলাম। আনিকা বেডসাইড ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিলেন। ঘরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল। আমরা দুজনে সেই বিশাল, নরম কমফোর্টারের নিচে নিজেদেরকে ডুবিয়ে দিলাম। আমি আনিকাকে আমার বুকের ভেতর টেনে নিলাম। উনার মাথাটা আমার কাঁধের ওপর। উনার একটা হাত আমার বুকের ওপর রাখা। আমি আমার এক হাত দিয়ে উনার পিঠ জড়িয়ে ধরে আছি। উনার শরীরের সেই মিষ্টি, সতেজ ঘ্রাণটা আমার নাসারন্ধ্রে এসে লাগছে। আমি উনার কপালের ওপর একটা দীর্ঘ, পরম আদরের চুমু খেলাম। আনিকা আমার বুকের ভেতর আরও একটু গুটিসুটি মেরে ঢুকে গেলেন। উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বললেন, "গুড নাইট, রাশেদ।" "গুড নাইট, আনিকা।" আমি চোখ বন্ধ করলাম। ঢাকা শহরের এই যান্ত্রিক, কোলাহলময় পৃথিবীতে, এই ধানমন্ডির ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার একটা ফ্ল্যাটে, আমি রাশেদ আহমেদ আজ রাতে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হিসেবে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার মাথার ভেতর এখন কোনো কিম জং উন নেই, কোনো মেসের কার্ফ্যু নেই, কোনো তিন লাখ টাকার উমরাহ ফান্ডের টেনশন নেই। এখন শুধু আছে এই অন্ধকার, এই কমফোর্টারের ওম, আর আমার বাহুডোরে বন্দী থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী। জীবনটা সত্যিই মাঝে মাঝে খুব অদ্ভুত, আর খুব সুন্দর। সকালের আলো যখন ধানমন্ডির এই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের ভারী পর্দা ভেদ করে ভেতরে ঢোকার বৃথা চেষ্টা করছিল, আমার ঘুম তখন ভেঙে গেছে। আমার বুকের ওপর পরম নিশ্চিন্তে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছেন আনিকা নাওহার। উনার নিশ্বাসের একটা অদ্ভুত, শান্ত ছন্দ আছে। আমি খুব সাবধানে, যেন একটা কাঁচের পুতুল নাড়াচাড়া করছি, এমন ভঙ্গিতে উনার মাথাটা আমার বুক থেকে সরিয়ে নরম বালিশের ওপর রাখলাম। উনি ঘুমের ঘোরেই একটু উসখুস করলেন, তারপর কমফোর্টারটা জড়িয়ে ধরে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। আমি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে উনার ঘুমন্ত, এলোমেলো মুখটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। পৃথিবীর সমস্ত রোমান্টিক উপন্যাসের হিরোরা এই সময় যেটা করে, সেটা হলো প্রেমিকার কপালে একটা চুমু খেয়ে, তাকে বাহুডোরে আটকে সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকে। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমি কোনো রোমান্টিক উপন্যাসের হিরো নই। আমি ঢাকা শহরের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত, পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের অনুবাদক। আমার বিছানায় স্বর্গের অপ্সরী শুয়ে থাকলেও, আমাকে ঠিক দশটার সময় কারওয়ান বাজারের অফিসে গিয়ে হাজিরা খাতায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে হবে। পুঁজিবাদী সমাজ বড়ই নিষ্ঠুর। সে মানুষের প্রেম বোঝে না, সে বোঝে প্রডাক্টিভিটি। আমি বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হলাম। কাল রাতের সেই ধুলোমাখা শার্ট আর প্যান্টটাই আবার গায়ে চাপাতে হলো। যাওয়ার আগে আমার মনে হলো, আনিকা ঘুম থেকে উঠে তো ক্ষুধার্ত থাকবেন। কাল রাতে আমরা শুধু এক বাটি ম্যাগি নুডলস খেয়েছি। আমি ড্রয়িংরুমে এসে আমার মোবাইল থেকে ফুডপান্ডা অ্যাপটা ওপেন করলাম। সকালের নাশতা হিসেবে কী অর্ডার করা যায়? আমি নিজের জন্য একটা চিকেন স্যান্ডউইচ আর ব্ল্যাক কফি অর্ডার করলাম। কিন্তু আনিকার জন্য? আমি তো জানি না উনি সকালে কী খেতে পছন্দ করেন। লন্ডনে থাকা মানুষ, হয়তো সকালে শুধু কর্নফ্লেক্স বা ওটস খান। আবার এমনও তো হতে পারে, দেশে এসেছেন বলে দেশি খাবার খেতে ইচ্ছে করছে! আমি কোনো রিস্ক নিলাম না। আমি আনিকার জন্য একটা স্যান্ডউইচ, একটা চিকেন শর্মা এবং এক বক্স ভুনা খিচুড়ি অর্ডার করে দিলাম। তিন ধরনের তিন আইটেম। ঘুম থেকে উঠে উনার যেটা মুড হবে, উনি সেটা খাবেন। খাবার এলে আমি নিজের স্যান্ডউইচটা ড্রয়িংরুমে বসেই গিলে নিলাম। আনিকার খাবারগুলো ডাইনিং টেবিলে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলাম। তারপর উনাকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ ড্রাফট করলাম: "আমি অফিসে বের হলাম। ডাইনিং টেবিলে তোমার নাশতা রাখা আছে। ঘুম থেকে উঠেই খেয়ে নিও। আমি অফিস শেষ করে সরাসরি চলে আসব।" মেসেজটা সেন্ড করে আমি খুব সাবধানে ফ্ল্যাটের দরজা লক করে বেরিয়ে এলাম। নিচে নেমে রিকশা খুঁজছি, এমন সময় পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। আনিকার রিপ্লাই এল নাকি? ফোন বের করে দেখি, মেসেজ এসেছে ঠিকই, তবে আনিকার নয়। মেসেজ এসেছে আমার মিরপুরের মেসের বয়োজ্যেষ্ঠ রুমমেট, বিসিএস পরীক্ষার্থী রাজুর কাছ থেকে। রাজু লিখেছে: "রাশেদ ভাই, ঘটনা কী? গত দুই দিন ধইরা আপনের কোনো খোঁজখবর নাই! রাইতে মেসে ফেরেন না। আপনের মিল তো চালু। খালায় রান্ধা রাইখা যায়, আর সেই খাবার নষ্ট হইতেছে। মেসের খাবার নষ্ট হওয়া তো ভাই জাতীয় পাপ! আপনি কি হঠাৎ কইরা কাউকে কিছু না বইলা গ্রামের বাড়ি নওগাঁ চইলা গেলেন নাকি?" আমি মেসেজটা পড়ে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারলাম না। আমার জীবনের এক প্রান্তে আনিকা নাওহারের মতো একটা বিলিয়নিয়ার, আভিজাত্যে মোড়ানো নারীর সাথে এক বিছানায় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা; আর অন্য প্রান্তে মেসের এক প্লেট ডাল-ভাত নষ্ট হওয়া নিয়ে বিসিএস পরীক্ষার্থীর হাহাকার! এই দুই চরম বৈপরীত্য নিয়েই তো আমার জীবন। আমি রাজুকে রিপ্লাই দিলাম: "বাড়ি যাইনি রাজু। একটা ইমার্জেন্সি কাজে আটকা পড়েছি। আজ রাতে মেসে ফিরব।" আজ রাতে মেসে ফিরব— এই কথাটা লিখে আমি নিজেই নিজের সাথে একটা প্রতারণা করলাম। আমি খুব ভালো করেই জানি, আমার মন, আমার শরীর, আমার পুরো অস্তিত্ব এখন ওই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের জন্য ছটফট করছে। কিন্তু মেসে তো আমাকে একবার যেতেই হবে। আমার প্রতিদিনের ব্যবহার্য কাপড়চোপড়, শেভিং কিট, ডিকশনারি— এগুলো তো আনতে হবে। কারওয়ান বাজারের অফিসে যখন পৌঁছালাম, তখন দশটা বেজে দশ মিনিট। এহসান ভাই যথারীতি ল্যাপটপের ওপর হুমড়ি খেয়ে আছেন। আমাকে দেখেই বললেন, "রাশেদ, আজকে কিন্তু আমেরিকার পলিটিক্স নিয়ে বেশ কয়েকটা ভাইটাল নিউজ আছে। তুমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে নিয়ে যে স্পেশাল রিপোর্টটা আসছে, সেটা ধরো।" আমি সুবোধ বালকের মতো ডেস্কে গিয়ে বসলাম। ল্যাপটপ অন করে জ্যারেড কুশনার আর তার স্ত্রী ইভাঙ্কা ট্রাম্পের একটা নিউজ ওপেন করলাম। স্ক্রিনে জ্যারেড আর ইভাঙ্কার একটা খুব সুন্দর, গ্ল্যামারাস ছবি ভাসছে। জ্যারেড কুশনার লম্বা, সুঠাম দেহের অধিকারী, পরনে দামি স্যুট। আর ইভাঙ্কা ট্রাম্প একটা চমৎকার গাউন পরে স্বামীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি নিউজটা অনুবাদ করতে শুরু করলাম। কিন্তু আধা ঘণ্টা পার হওয়ার পর আমি খেয়াল করলাম, আমার মাথার ভেতর এক অদ্ভুত হ্যালুসিনেশন শুরু হয়েছে। আমি স্ক্রিনের ওই ছবির জ্যারেড কুশনারের মুখের জায়গায় নিজের মুখটা দেখতে পাচ্ছি! আর ইভাঙ্কা ট্রাম্পের ওই সোনালি চুলের জায়গায় আমি দেখতে পাচ্ছি আনিকা নাওহারের সেই অবাধ্য, কালো, ভেজা চুল। আনিকা উনার সেই অফ-হোয়াইট শাড়ি পরে আমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। উনার সেই মোহনীয় হাসি, উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর নিখুঁত লাস্যময়ী শরীরটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আহা! কী অদ্ভুত, কী ঐশ্বরিক সেই দৃশ্য! আমি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। প্রেমের চেয়ে বড় জাদুকর আর কেউ নেই। প্রেম একটা পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের ম্যাড়ম্যাড়ে অনুবাদককে মুহূর্তের মধ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বিলিয়নিয়ার জামাইয়ের সাথে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়। ঘড়ির কাঁটা যখন দুপুর বারোটা ছুঁল, আমার হোয়াটসঅ্যাপটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে আনিকার নাম। আমার হৃৎপিণ্ডটা একটা লাফ দিল। আমি দ্রুত মেসেজটা ওপেন করলাম। এখান থেকে শুরু হলো আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত টেক্সটিং বা মেসেজ আদান-প্রদান।  আনিকা: "গুড মর্নিং! এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলাম। টেবিলে দেখি এলাহি কারবার! স্যান্ডউইচ, শর্মা, আবার সাথে ভুনা খিচুড়ি! তুমি কি ভেবেছ আমি সকালে উঠে রাক্ষসের মতো খাওয়া শুরু করব?" আমি: "গুড মর্নিং! আমি তো জানতাম না সকালে তোমার মুড কেমন থাকবে। যদি ব্রিটিশ মুডে থাকো, তাই স্যান্ডউইচ। আর যদি খাঁটি বাঙালি মুডে থাকো, তাই খিচুড়ি। সেফ সাইডে থাকার জন্য সব অপশন ওপেন রেখেছি।" আনিকা (হাসির ইমোজি দিয়ে): "হা হা হা! তুমি সত্যিই পাগল। থ্যাংকস ফর দ্য ফুড। খিচুড়িটাই খাচ্ছি এখন। এনিওয়ে, শোনো, একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।" আমি: "বলো। শুনছি।" আনিকা: "আমি দেশে আর মাত্র আট-নয় দিন আছি। এই কয়দিন আমি চাই না তুমি ওই মিরপুরের মেসে যাও। তুমি আজ থেকে ডিরেক্ট অফিস থেকে ধানমন্ডিতে আসবে। এখান থেকেই অফিসে যাবে। এটাই এখন তোমার বাসা।" আমি: "সেটা কী করে হয় আনিকা? আমার তো মেসে একবার যেতেই হবে। আমার প্রতিদিনের ব্যবহার্য কিছু জিনিসপত্র, অফিসের কাপড়চোপড়— এগুলো তো আনতে হবে।" আনিকা: "কিচ্ছু লাগবে না রাশেদ। কিচ্ছু না। তোমার যা যা লাগবে, সব আমি ম্যানেজ করে রাখব। এই ফ্ল্যাটে সব আছে। তুমি জাস্ট অফিস শেষ করে একটা উবার নিয়ে সোজাসুজি আমার এখানে চলে আসবে। আন্ডারস্টুড?" আমি: "বাবাহ! এটা কি রিকোয়েস্ট নাকি ডিরেক্ট অর্ডার?" আনিকা: "এটা অর্ডার। লন্ডনের সিইও আনিকা নাওহারের অর্ডার না, এটা তোমার আনিকার অর্ডার। তুমি এই আট দিন পুরোপুরি আমার। আমি তোমাকে এক মুহূর্তের জন্যও অন্য কোথাও শেয়ার করতে চাই না।" আমি: "তোমার এই অর্ডারের সামনে তো দেখি জাতিসংঘের রেজুলেশনও ফেইল মারবে। ঠিক আছে মাই লর্ড, তোমার হুকুমই শিরোধার্য। আমি ডিরেক্ট ধানমন্ডিই আসব।" আনিকা (ভালোবাসার ইমোজি দিয়ে): "গুড বয়। আমি বিকেলে মেলায় যাব। তুমি অফিস থেকে ডিরেক্ট মেলায় চলে আসবে। ওখান থেকে আমরা একসাথে বাসায় ফিরব। আই মিস ইউ।" আমি: "আই মিস ইউ টু। মেলায় দেখা হচ্ছে।" মেসেজ পর্ব শেষ হওয়ার পর আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা বোকা হাসি হাসলাম। আমার বুকের ভেতরটা একটা উষ্ণ, মধুর অনুভূতিতে ভরে গেল। একজন নারী যখন তার অধিকারবোধের জায়গা থেকে এমনভাবে শাসন করে, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাধীন পুরুষটারও সেই শাসনের শেকলে বাঁধা পড়তে ভালো লাগে। আমি আর মিরপুরে যাব না। আগামী আট-নয় দিন আমার ঠিকানা ধানমন্ডির ওই বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। কিন্তু আমার তো সারাদিন অফিস। আনিকা চলে যাবে আট-নয় দিন পর। এই কটা দিন যদি আমি অফিসে দশ ঘণ্টা করে সময় কাটাই, তাহলে উনাকে সময় দেব কখন? আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। দুপুর দুইটার দিকে আমি এহসান ভাইয়ের ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। "এহসান ভাই, একটু কথা ছিল," আমি খুব বিনয়ী গলায় বললাম।এহসান ভাই ল্যাপটপের কি-বোর্ড থেকে হাত না সরিয়েই বললেন, "বলো। কোনো নিউজে ঝামেলা?"  "না ভাই। নিউজ সব ক্লিয়ার। আমি আসলে ছুটির ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিলাম।" ‘ছুটি’ শব্দটা শোনার সাথে সাথে এহসান ভাইয়ের হাতের টাইপিং থেমে গেল। কর্পোরেট অফিসে বসদের কাছে ‘ছুটি’ শব্দটা একটা অ্যালার্জির মতো। এই শব্দ শুনলেই তাদের গায়ে চুলকানি শুরু হয়ে যায়। "ছুটি? হঠাৎ ছুটি কেন? তোমার তো কোনো সিক লিভ বা ইমার্জেন্সি কিছু শুনিনি," এহসান ভাই ভ্রু কুঁচকে বললেন। "ইমার্জেন্সি কিছু না ভাই। আমার অ্যানুয়াল লিভ থেকে বেশ কিছু ছুটি তো পাওনা আছে। আমি সামনের এক সপ্তাহ, মানে আগামী সাত দিন ছুটি নিতে চাচ্ছিলাম।" এহসান ভাই এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যেন আমি তার কাছে তার একটা কিডনি চেয়ে বসেছি। অফিসে যারা কাজ ফাঁকি দেয়, যারা ফাঁকিবাজ, তারা ঠিকই মাসের পর মাস ছুটি ম্যানেজ করে ফেলে। কিন্তু আমার মতো গাধা টাইপের কর্মী, যারা চুপচাপ নিজের ডেস্কের কাজটুকু করে যায়— তারা যখন তাদের প্রাপ্য ছুটিটুকু চায়, তখন বসদের মনে হয় আসমান ভেঙে পড়েছে। "এক সপ্তাহ! পাগল হয়েছ রাশেদ?" এহসান ভাই নড়েচড়ে বসলেন। "এখন তো ইন্টারন্যাশনাল নিউজের চরম ক্রাইসিস টাইম। ইউক্রেন-রাশিয়া, মিডল-ইস্ট সব জায়গায় আগুন জ্বলছে। তুমি চলে গেলে এই ডেস্কে আমি আর মামুন মিলে কীভাবে সামলাব?" আমি খুব শান্তভাবে লজিক দিলাম, "ভাই, আমার ছুটিগুলো তো আমার পাওনাই ছিল। আমি তো সারা বছর কোনো ছুটি নিইনি। আর মামুন একাই পারবে, ও এখন খুব ফাস্ট নিউজ নামাতে পারে।" "উঁহু! আহা! এটা কেমন কথা হলো!" এহসান ভাই মাথা নাড়তে লাগলেন। "হঠাৎ করে এক সপ্তাহের ছুটি দেওয়া খুব ডিফিকাল্ট। তুমি বরং দুই দিনের ছুটি নাও।" আমি ছাড়ার পাত্র নই। আমার কাছে এখন কিম জং উন বা জো বাইডেনের চেয়ে আনিকা নাওহারের সাথে কাটানো প্রতিটা সেকেন্ড অনেক বেশি মূল্যবান। আট-নয় দিন পর উনি চলে যাবেন আট হাজার মাইল দূরে। এই সময়টুকু আমি কোনো কর্পোরেট দাসত্বে নষ্ট করতে রাজি নই। "ভাই, আমার এটা খুব ইমার্জেন্সি। আমাকে এক সপ্তাহের ছুটিটা দিতেই হবে," আমি একটু শক্ত গলায় বললাম। এহসান ভাই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, আজ এই ছেলেটা নাছোড়বান্দা। উনি একটা বিরক্তিকর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।"ঠিক আছে। কিন্তু আজ আর কাল তোমাকে ফুল অফিস করতে হবে। পরশু দিন থেকে তুমি এক সপ্তাহের লিভে যাও। আমি এইচআরে মেইল করে দিচ্ছি।" আমি মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। পরশু থেকে এক সপ্তাহ মানে আনিকার ফ্লাইট পর্যন্ত আমি পুরোপুরি ফ্রি। উনার পুরো সময়টাই আমি আমার করে নিতে পারব। "থ্যাংক ইউ ভাই," বলে আমি নিজের ডেস্কে ফিরে এলাম। বিকেলে আনিকার কথামতো আমি মেসেজ দিয়ে আমার মেসের ম্যানেজার (যে আসলে আমাদেরই একজন রুমমেট) তুহিনকে জানিয়ে দিলাম: "তুহিন, আমি আগামী আট-নয় দিন মেসে আসব না। আমার মিল আজ থেকে বন্ধ রাখিস। আমার একটা পার্সোনাল কাজ আছে, ঢাকার বাইরে থাকতে হতে পারে।" তুহিন রিপ্লাই দিল: "ওকে ব্রাদার। নো টেনশন। আই উইল ম্যানেজ।" ব্যাস। মিরপুরের সাথে আমার আগামী আট দিনের সমস্ত সম্পর্ক অফিশিয়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমি বাংলা একাডেমির বইমেলায় পৌঁছালাম। আজ মেলায় আমার হাঁটার ভঙ্গিটা অন্য দিনের মতো ছিল না। গত কয়েকদিন আমি আনিকার পাশে হাঁটতাম একজন স্টকার বা একজন মুগ্ধ ভক্ত হিসেবে। খুব সাবধানে, আড়ষ্ট হয়ে, পাছে উনি কিছু মনে করেন! কিন্তু আজ... আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি মেলায় আনিকাকে খুঁজে বের করলাম। উনি আজ একটা হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি পরেছেন। উনাকে দেখেই আমি এগিয়ে গিয়ে, মেলা প্রাঙ্গণের হাজারো মানুষের ভিড়ের মাঝখানেই খুব সাবলীলভাবে উনার ডান হাতটা আমার হাতের মুঠোয় তুলে নিলাম। আনিকা একটু চমকে আমার দিকে তাকালেন, তারপর উনার মুখে একটা প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। উনিও উনার আঙুলগুলো আমার আঙুলের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে নিলেন। আমরা মেলায় হাঁটছি। হাতে হাত রেখে। আমাদের হাঁটার মধ্যে এমন একটা অধিকারবোধ, এমন একটা ক্যাজুয়াল কনফিডেন্স ছিল— দূর থেকে দেখলে যে কারো মনে হবে আমরা বহু বছরের বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী। ঢাকা শহরের এই ভিড়ে কেউ আমাদের চেনে না, কেউ আমাদের দিকে জাজমেন্টাল দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে না। আজ আমার ভেতরে কোনো অস্বস্তি নেই, কোনো ভয় নেই। আমার হাতের মুঠোয় এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারীর হাত। আনিকা আজ বেশ মেজাজে আছেন। উনি লিটল ম্যাগ চত্বর থেকে শুরু করে বড় বড় প্যাভিলিয়ন— সব জায়গায় ঘুরলেন। উনি অনেকগুলো বই কিনলেন। বেশিরভাগই কবিতার বই, আর কিছু লাতিন আমেরিকান উপন্যাসের অনুবাদ। বইয়ের ব্যাগগুলো আমি এক হাতে বইছি, আর অন্য হাতে আনিকার হাত। "তোমার তো দেখি সাহিত্যের প্রতি বেশ ভালোই টান আছে," আমি উনার দিকে তাকিয়ে বললাম। "আমি তো সাহিত্যিক মানুষ রাশেদ। আমি তো শুধু আইটি ফার্মের সিইও না," আনিকা হাসিমুখে বললেন। "আর তাছাড়া, লন্ডনের ওই যান্ত্রিক জীবনে এই বাংলা বইগুলোই তো আমাকে আমার শেকড়ের সাথে জুড়ে রাখে।" রাত সাড়ে আটটার দিকে মেলার গেট বন্ধ হওয়ার অ্যানাউন্সমেন্ট শুরু হলো। আমরা মেলা থেকে বেরিয়ে এলাম। আজ আমি আর রিকশা ডাকলাম না। আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে উবার অ্যাপে একটা এসি গাড়ির রিকোয়েস্ট দিলাম। আমার মনে হলো, আজ আনিকাকে রিকশার ঝাঁকুনিতে নেওয়াটা ঠিক হবে না। তাছাড়া, আমার পকেটের অবস্থা যাই হোক না কেন, আমি এখন উনার ‘অফিশিয়াল’ পার্টনারের মতো ফিল করছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই উবারের সাদা রঙের একটা সেডান গাড়ি এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল। আমরা পেছনের সিটে গিয়ে বসলাম। গাড়ির এসি চলছে। জানালার কাঁচ বন্ধ। বাইরের কোলাহল একদম শূন্যে নেমে এসেছে। "ধানমন্ডি যাবেন তো স্যার?" ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল। আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ার আগেই আনিকা হঠাৎ বলে উঠলেন, "ভাইয়া, একটু আড়ংয়ের সামনে দিয়ে যাবেন। সায়েন্স ল্যাবের আড়ংয়ে একটু থামতে হবে।" আমি অবাক হয়ে আনিকার দিকে তাকালাম। "আড়ংয়ে? এই রাতে আড়ংয়ে কী কাজ?" আনিকা আমার দিকে ফিরে একটা রহস্যময় হাসি দিলেন।