ছায়ার আড়ালে আগুন-Erotic Thriller [Part-4: অন্তিম যুদ্ধ] - অধ্যায় ৭৩
গল্প: "ছায়ার আড়ালে আগুন" (পার্ট-৪: অন্তিম যুদ্ধ)
ত্রিসপ্ততিতম পরিচ্ছেদ: হিসেবের প্রশ্ন
রুবিনা বেগমের মৃত্যুর পর ব্যবসার হিসেবপত্র একটু ওলটপালট হয়েছে। অংশুমান সেই হিসেব দেখতে বসেছিল।
রাতে অন্তরা ফ্ল্যাটে এসেছে। আর্য ঘুমিয়ে আছে অন্য ঘরে। অংশুমান টেবিলের উপর কয়েকটা কাগজ ছড়িয়ে রেখেছে। কলম হাতে হিসেব মিলিয়ে দেখছিল। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় তার মুখটা গম্ভীর দেখাচ্ছিল। অন্তরা শাড়ি পরে এসে দাঁড়াল। হাতে কোনো বাসন নেই, কোনো কাজের ভান নেই। শুধু দাঁড়িয়ে আছে। অংশুমান মাথা না তুলেই বলল,
“এই মাসের খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। গুদামের ভাড়া, লোকজনের খরচ, গাড়ির তেল, মাল সরবরাহের খরচ— সবকিছুতেই বাড়তি দেখাচ্ছে। আগের তিন মাসের গড়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। কী ব্যাপার?”
অন্তরা একটু থেমে গেল। সে টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল, “সবকিছুর দাম বাড়ছে। আর রুবিনা থাকতে যেভাবে চলত, এখন সেভাবে চলে না। আমাকেই সব দেখতে হয়। লোকজনকে সামলাতে হয়। ছোটখাটো সমস্যা গুলো আমি নিজে মিটিয়ে দিই। তাতে খরচ একটু বাড়ে।”
“তোমাকেই দেখতে হয় বলে খরচ বাড়বে?” অংশুমান এবার মাথা তুলে তাকাল। গলায় চাপা বিরক্তি। “আমি হিসেব দিয়েছিলাম। তার বাইরে এত টাকা কোথায় যাচ্ছে? প্রতিটা খরচের বিল কোথায়?”
অন্তরার মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে এক পা এগিয়ে এল। “তুমি হিসেব দিয়েছ। কিন্তু কাজ আমি করি। লোকজনের সঙ্গে কথা আমি বলি। সমস্যা হলে আমি সামলাই। তুমি শুধু কাগজ দেখো। কাগজে সব পরিষ্কার দেখায় না। বাস্তবে কী হয়, সেটা আমি জানি।”
অংশুমান চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। টেবিলের উপর হাত রেখে বলল, “আমি কাগজ দেখি বলেই তো ব্যবসা এখনো টিকে আছে। তুমি যদি নিজের মতো করে খরচ বাড়াতে থাকো, তাহলে হিসেব রাখার মানে কী? আমি কি শুধু টাকা জোগান দেওয়ার লোক?”
“নিজের মতো করে?” অন্তরা সামান্য এগিয়ে এল। গলায় রাগের চাপ। “আমি কি তোমার চাকর? রুবিনা থাকতে আমি চুপ করে থেকেছি। রুবিনা যা বলত, তাই করতাম। এখন রুবিনা নেই। এখন আমি সব সামলাই। আর তুমি শুধু খরচের হিসেব নিয়ে প্রশ্ন করো? তুমি কি কখনো জিজ্ঞেস করেছ কাজটা কীভাবে সামলাতে হচ্ছে?”
অংশুমানের চোখ সরু হয়ে এল। “তুমি সামলাও বলেই আমি প্রশ্ন করছি। ব্যবসা আমার। টাকা আমার। তুমি শুধু দেখাশোনা করো। নাম কাগজে আছে বলে তুমি মালিক হয়ে যাওনি।”
অন্তরা হাসল। হাসির মধ্যে রাগ ছিল। “শুধু দেখাশোনা? কাগজে নাম আমার। লোকজন আমাকেই চেনে। গুদামের চাবি আমার কাছে। হিসেব আমি রাখি। আর তুমি বলো আমি শুধু দেখাশোনা করি? তাহলে আমি কেন এতটা দায়িত্ব নেব? তুমি নিজে সামলাও। আমি হাত তুলে নিচ্ছি।
দুজনের মধ্যে নীরবতা পড়ল। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। অংশুমান বুঝতে পারছিল অন্তরা আর আগের মতো নয়। রুবিনা থাকতে যে মেয়েটা মাথা নিচু করে কাজ করত, চোখ নামিয়ে কথা শুনত, সেই মেয়েটা এখন মাথা তুলে জবাব দিচ্ছে। চোখে চোখ রেখে কথা বলছে।
“তুমি সীমা ছাড়াচ্ছিস,” অংশুমান আস্তে করে বলল। গলায় সতর্কবার্তা।
“সীমা তুমিই তৈরি করেছ,” অন্তরা জবাব দিল। “তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ। কাগজে নাম দিয়েছ, কাজ দিয়েছ, রাতে ডেকেছ। এখন আমি যখন হিসেব চাই, তখন তুমি খরচের প্রশ্ন তোলো। আমি আর শুধু ব্যবহারের পাত্র হয়ে থাকতে চাই না। তুমি যদি সব ব্যাপারে মাথা গলাতে চাও, তাহলে আমিও আমার হিসেব আলাদা করে রাখব। তোমার প্রশ্ন যেমন চলবে, আমার জবাবও তেমনই চলবে।
অংশুমান চুপ করে রইল। সে জানত ঝগড়া বাড়ালে এখন লাভ নেই। অন্তরা দরকারি। গুদাম, লোকজন, কাগজপত্র— সব তার হাতে। কিন্তু মেয়েটা পালটে যাচ্ছে। রুবিনার মৃত্যুর পর সে নিজের জায়গা বুঝে ফেলেছে।
“আজ রাতে আর নয়,” অংশুমান শেষে বলল। “কাল হিসেব মিলিয়ে দেখব। সব বিল নিয়ে এসো।”
অন্তরা মাথা নাড়ল। “কাল মিলিয়ো। কিন্তু শুধু হিসেব নয়। আমিও কিছু কথা বলব। এবার শুধু তোমার প্রশ্ন চলবে না। আমিও আমার জায়গা চাইব।”
সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা ঘরে বাজল। অংশুমান একা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারছিল— খরচের প্রশ্ন দিয়ে শুরু হলেও, আসল লড়াইটা অন্য জায়গায় গড়াচ্ছে।
অন্তরা আর পেছনে থাকতে চাইছে না। সে এখন হিসেবের জবাব দিচ্ছে। আর জবাবের সঙ্গে সঙ্গে দাবিও তুলছে।