আরেকটি নিষিদ্ধ প্রেমের গপ্পো - অধ্যায় ১৬
(৫)চ— কিছু মায়া ,কিছু স্মৃতি।
মা আমাকে আদর করে ঘর থেকে চলে যাবার পর ,আমার চোখ ঘুমে জড়িয়ে এসেছিলো সেইদিন।
আমি ঘুমের মধ্যে দেখতে পেলাম , কেমন ধোঁয়াটে একটা নির্জন শান্ত জায়গা। চারিদিক পাহাড়ে ঘেরা শীতল সেই জায়গাটা । কিছুদূরেই একটা ধোঁয়ায় ঢাকা অস্পষ্ট নদী ধীর ভাবে বয়ে চলেছে ।
জায়গাটা এতটাই নির্জন যে কূল কূল শব্দের নদীর শান্ত জলধারা বয়ে যাবার শব্দটাও ভেসে আসছে কানে।
কেমন অচেনা একটা জায়গা। আমিই বা কিভাবে এলাম এই জায়গায় আর পালিয়েই বা কোথায় যাবো এমনটাই ভাবলাম খানিকক্ষণ ধরে।
কিছুদূরে ,দেখতে পেলাম নদীটার সামনে ধোঁয়াটে জায়গাটাতে একটা সাদা পোশাকের কে যেন বসে রয়েছে।
আমি আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছি ওই নদীটার দিকে। আর ওই ধোঁয়ায় মোড়া সাদা পোশাকের চেহারাটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
যত এগোচ্ছি নদীটার দিকে ধোঁয়াটে আবছা আবরণটা ততো পরিষ্কার হচ্ছে। আর পরিষ্কার হতে হতেই থমকে দাঁড়ালাম।
এ তো একটা পরী !
হাটু মুড়ে ,মাথা নিচু করে বসে রয়েছে নদীটার ধারে। একা একা।
বিশাল বিশাল দুটো সাদা সাদা পাখনা দুই কাঁধের দুই পাশে ঝুলছে তার ।
চুপ করেই দাঁড়িয়ে রইলাম। এগোলাম না।
অচেনা জায়গাটার চারিপাশ ঘুরে ঘুরে দেখছি মাথা তুলে গোল গোল করে ।
আকাশটা যেন গোলাপি। দিন না রাত কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আকাশে চাঁদ ও রয়েছে। কিন্তু অনেক গুলো চাঁদ। মনে মনে ভাবলাম এ আবার কোন গ্রহ রে বাব্বা ।
দেখতে দেখতে, পরীটা আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়েছে দেখলাম। বোধয় আমাকে দেখতে পেয়েছে সে। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে দু-পা পিছনে সরে গেলাম।
তারপর পরীটা আমাকে ডাকছে , দু হাত তুলে। আলতো করে হাত নেড়ে নেড়ে !
আমি স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকলাম পরীটার দিকে। সাদা আবরণে ঢাকা পরীটার সারা দেহ , সাদা পাখনা দুটো দুপাশে মেলে ধরেছে।
ভাবলাম আমাকে নিয়ে যদি পালিয়ে যায় অন্য কোথাও,ওই অচেনা সুন্দরী ফারিস্তাটি !
সাথে সাথে চোখ গেল পরীটার মুখের দিকে। মুখতুলে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে দেখছি, পরীটা ।
চমকে উঠলাম। পরীটিকে দেখে !
এ যে আমার মায়ের মুখ।
আমার মা পরী হয়ে গেল কি ভাবে ! আর এখানেই বা এল কি ভাবে। কি আশ্চর্য ! এই পরীটি কি তবে আমার মা ?
আমি যে আমার হৃদয়ের ,শ্রেষ্ঠ নারীর স্থান দখল করে রাখা নারীটিকেই তো দেখছি!
আমি মাকে দেখেই ছুটতে লাগলাম পরীটার দিকে ,মায়ের কাছে যাব বলে!
কিন্তু ছুটছি তো ছুটছি কিছুতেই জায়গাটাতে যেতে আর পারছি না।
আমি হাঁপিয়ে যাচ্ছি ,কিন্তু কিচ্ছুতেই মায়ের কাছে যেতে পারছি না .....
আমি দুই হাত সামনে বাড়িয়ে প্রানপনে ছুটেই চলেছিলাম , আপ্রাণচেষ্টা করেচলেছিলাম মায়ের কাছে যাবার জন্যে ,কিন্তু কিচ্ছুতেই মায়ের কাছে যেতে কিন্তু পারছিলাম না।
এইভাবে কিছুক্ষন দৌঁড়ানোর পর আবার আমি দেখতে পেলাম ,আমি ঠিক সেই অচেনা নতুন জায়গাটিতেই দাঁড়িয়ে আছি ,যেখানে আমি প্রথমে এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি আর দৌড়াচ্ছি না। দাঁড়িয়ে রয়েছি!
আবার সেই সাদা হিমশীতল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ,চারিদিক নিঃশব্দ ,কিছুদূরে এক শান্ত নদীর ধারা বয়ে চলেছে ,সেখানে একজন পরী মাথা নিচু করে বসে রয়েছে নদীর ধারে ,
পরীটির মধ্যে আমি মাকে দেখতে পাচ্ছি ,আমি মার দিকে দুহাত সামনের দিকে উচুকরে দৌড়াচ্ছি ! মায়ের কাছে যাবার প্রানপন চেষ্টাও করছি।
—" মা ...মা ... মা ... আমি আসছি , আসছি !"
তুমি ওখানেই দাঁড়াও ! বলে চিৎকার করতে করতে।
ঘটনাটা বারে বারে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটে চলেছে। ক্রমাগত ! চক্রাকারে আবর্তের মতো! আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। একি এক ঘটনার আবর্তে নিজে জড়িয়ে গেছি আমি!
ভাবলাম এটা একটা মায়াজাল। আর আমার মাকে যেন কেও সেই মায়াজালে আটকে রেখেছে। আমি মা কে দেখতে পেয়েও যেন মায়ের কাছে যেতে পারছি না কিছুতেই!
এমন সময়.....
হঠাৎ কানের কাছে ভেসে এলো, কে যেন ভায়োলিন বাজাচ্ছে।
ভায়োলিনের সেই বিষণ্ণ, মৃদু, অশ্রুসিক্ত আর্তনাদের সুর ,এ সুর আমার বহুদিনের পরিচিত।
আমি ঘুমের ঘোরে বিছানা থেকে উঠে খাটে বসলাম। নাইট ল্যাম্পটা জ্বালালাম।
আমার গায়ে টিশার্ট নেই। খালি গায়ে খাটে বসে হাঁপাচ্ছি ।
কিন্তু এত রাত্তিরে কে তবে ভায়োলিন বাজাচ্ছে?
সাথে সাথে তাকালাম দেয়ালের দিকে আমার গিটারটার ঠিক পাশে।
ধুলো জমে থাকা মায়ের ভায়োলিনের বক্সটা নেই।
গভীর রাত্রে একা খাটে বসে ভাবছি, আর কান পেতে শুনছি ভায়োলিনের একাকিত্বের নিঃশব্দ কান্না,হাহাকারের সেই মৃদু ধ্বনি।
আমার আর বুঝতে একটুও দেরি হলো না এ সুর আমার মায়ের। আর কারোর হতেই পারে না।
স্মৃতিমাখা বেদনার এই ধ্বনি আমি বহুবার শুনেছি মায়ের কাছ থেকেই। আমিও স্মৃতির ভেতর ডুবে যাচ্ছি একটু একটু করে।
বেহালার হৃদয়বিদারক সুর যেন তীরের ফলার মতো এসে বিঁধছে কানে।
সেই ছোট্টবেলায়,যখন আমি মা আর বাবার সাথে মুম্বাইতে থাকতাম ছুটির দিনে মা আমাকে ভায়োলিন বাজিয়ে শোনাতো।
মায়ের হাতের বেহালার বো-এর টান, আমার স্মৃতির মণিকোঠায় চির-সতেজ যেন ।
বাবা যখন টলতে টলতে গভীর রাতে বাড়ি ফিরত, মা-বাবার মধ্যে ঝগড়া হতো, অশান্তি হতো মাকে দেখতাম নিঃশব্দে গুটিয়ে যেতে।
তখন বহুবার দেখেছি, গভীর রাতের নীরব বারান্দায়, মৃদু আলোয় টুলে বসে, মা ভায়োলিন বাজাচ্ছে। আর সেই সুরের ভেতর দিয়ে ঝরে পড়ছে মায়ের নিঃশব্দ কান্না।
আমি আমার পাশের ঘর থেকে মায়ের সেই ভায়োলিনের মর্মস্পর্শী সুর শুনতে পেয়ে ঘুম ভেঙে যেত আমার ।
আমি ঘুম থেকে উঠে ,চুপি চুপি দরজার আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতাম মায়ের সেই ভায়োলিনের করুন সুর।
আমি চুপিসারে দেখতাম মায়ের চোখ দিয়ে জল ঝরছে ।মায়ের একমনে একভাবে ভায়োলিনের মর্মস্পর্শী,হৃদয়বিদারক সুর ,সেই ছোট্টবেলায় আমার কানে ভেসে আসতো তখন ।
আমি তখন ভয় পেতাম মায়ের কাছে যেতে। আমি ঘুম থেকে উঠে গেছি বলে যদি আমাকে মা বকাবকি করে ,ধমক দেয় !
আমি আস্তে আস্তে খাট থেকে নামলাম। ঘরের দরজাটা আস্তে করে খুললাম।পা টিপে টিপে বারান্দার দিকে এগোতে লাগলাম। চারিপাশ নিঃশব্দ শুধু ভায়োলিনের সুর ভেসে বেড়াচ্ছে।
বারান্দায় পৌঁছে যা দেখলাম, তাতে আমার শ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। বারান্দার নাইট ল্যাম্পের নিস্তেজ আলোয় আমার বুঝতে অসুবিধে হলো না ওটা মা।
মা একটা টুলে বসে ভায়োলিন বাজাচ্ছে। মায়ের দিকে যত এগোচ্ছি, ততই ভায়োলিনের সেই কোমল, সুরেলা সঙ্গীত ধীরে ধীরে যেন ধারালো হয়ে উঠছে,
আমার বুকের ভিতরটা ফালা-ফালা করে চিরে চলেছে সেই সুরধ্বনি ।
মায়ের কাঁধের একপাশে চিবুক দিয়ে চেপে রেখেছে বেহালা । অন্য হাতে বো এর নিখুঁত টানে মা সুরের তরঙ্গের ঢেউ তুলে চলেছে।
খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকে পড়েছে বারান্দার ভেতরে। সেই আলো এসে পড়েছে মায়ের গায়ের ওপর।
পূর্ণিমা চাঁদের আলোর রশ্মি ঠিকরে পড়েছে মায়ের মখমলে চুলের উপর। সেই নরম, নীলাভ, স্বচ্ছ আলোর জ্যোৎস্নায় মা যেন স্নান করছে।
মায়ের মাথাটা একপাশে হালকা ঝুঁকে,বেহালাটি চিবুকের নিচে চাপা পড়েছে । খোলা চুল ,গাল ঢেকে নেমে এসেছে, মুখটা আড়াল করে রেখেছে আধাআধি।
প্রতিটা বো-এর টানে মায়ের শরীর হালকা কেঁপে উঠছে আর সেই কাঁপনের সঙ্গে সঙ্গে সুরটাও যেন আরও গভীর, আরও ব্যথাভরা হয়ে উঠছে।
আমি অনুভব করলাম সেই বহুদিনের পরিচিত, করুন সুর মা আজ আবার কেন বাজাচ্ছে ?
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।
মনে হচ্ছিল বহুদিন থেকে বাক্সবন্ধী হয়ে ধুলো জমে থাকা বেহালাটা শুধু সুর -তুলছে না, মায়ের ভেতরের সব চাপা কষ্ট, সব না-বলা কথা এক এক করে বেরিয়ে আসছে।
আর সেই সুর আমার হৃদয়কে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও গভীরে, যেখানে শুধু স্মৃতি, আর এক বিস্তীর্ণ মায়াভরা শূন্যতা রয়েছে সেখানে।
আমি মায়ের সামনে গিয়ে ,একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষন। তারপর একপ্রকার অসহ্য হয়েই চেপে ধরলাম বেহালার -বো টা।
মা আৎকে উঠেই আমার দিকে তাকালো।
হৃদয়স্পর্শী, বেদনার এ সুর থেমে গেল।
মায়ের চোখের কোনায় জল জমেছে। আমিও বারিসিক্ত নয়নে তাকালাম মায়ের দিকে।
আর মা কে বললাম ,
—"মা... তুমি এ সুর কেন তুলেছো আবার ? মা আমার এই সুর ভালো লাগে না। বন্ধ করো এ সব ! এক্ষুনি !"
সাথে সাথে আমি বো সমেত ভায়োলিন টা মায়ের হাত থেকে কেড়ে নিলাম।
ছুড়ে ফেললাম সোফার উপর। আমি হাঁটুমুড়ে বসে পড়লাম , টুলে বসে থাকা মায়ের ঠিক সামনেই।
আর সাথে সাথে মা কে জড়িয়ে ধরলাম। মায়ের কোলে মাথা রাখলাম। কাঁদলাম আমিও।
মা কে জড়িয়ে ধরে আবেগের সুরে অশ্রুসিক্ত কাঁপা গলায় বললাম,
—" আমার ঘরে চলো বলছি। ...এক্ষুনি। আমাকে ঘুমপাড়িয়ে দেবে তুমি !"
মায়ের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলতে ,মায়ের গালে হাত দিয়ে মুছিয়ে দিলাম মায়ের চোখের জল।
আর মা কে বললাম,
— "মা ,তুমি কাঁদবে না ,আমার ভালো লাগে না !তোমার চোখের জল দেখতে আমার ভালো লাগে না ! আমি সহ্য করতে পারি না মা !"
আমি উঠে দাঁড়িয়ে মা কে টুলথেকে টেনে তুললাম। মা কে হাত ধরে নিজের ঘরে নিয়ে এলাম। তারপর মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম ঠিক আগের মতোই।
ক্রমশ...