আরেকটি নিষিদ্ধ প্রেমের গপ্পো - অধ্যায় ২১
৭(গ)— প্রেমের অনেক রঙ।
রিসোর্টের ভেতরে মায়ের পিছন পিছন যেতে গিয়ে দেখি, আমাদের পাড়ার রিংগো আঙ্কেলও ওই একই রিসোর্টে এসেছেন।
আমাকে আর মাকে দেখেই রিংগো আঙ্কেল আর ওঁর স্ত্রী সোহিনী আন্টি আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন।
মাকে দেখে রিংগো আঙ্কেল বললেন,
— "কী রে অনামিকা, তোরা এই রিসোর্টেই উঠেছিস নাকি?"
মা হেসে বলল,
— "হ্যাঁ গো রিংগো দা , আজ সকালেই চেক-ইন করলাম।"
মাকে দেখে সোহিনী আন্টি বলল,
— "এই অনামিকা, তুমি কবে এলে কলকাতায়?"
মা মুচকি হেসে উত্তর দিল,
— "এই তো, ক'দিন হলো এসেছি।"
মা তখন রিংগো আঙ্কেল আর সোহিনী আন্টির সঙ্গেই কথা বলছিল। এমন সময় পাশ থেকে দেখলাম, রিংগো আঙ্কেলের যমজ ভাই বিংগো আঙ্কেল আর মানালি আন্টিও এসে হাজির।
বিংগো আঙ্কেল মাকে দেখে বলল,
— "কী রে অনামিকা, তুই কলকাতায় এলি আর একবারও জানালি না?"
মা একটু লজ্জা পেয়ে হেসে বলল,
— "আরে, সবকিছু এত তাড়াহুড়োয় হয়েছে যে কাউকেই আর জানানো হয়ে ওঠেনি।"
রিংগো আঙ্কেল মাকে জিজ্ঞেস করল,
— "কী রে, তুই এখন মুম্বাইয়ে কোন এম এন সি আছিস?"
মা বলল,
— "আগের টা ছেড়ে দিয়েছি। এখন একটা নতুন ফরেন এম এন সি তে আছি।"
রিংগো আঙ্কেল আর বিংগো আঙ্কেল আমাদের পাড়ার খুবই মজার মানুষ। দুজনেই আমার মায়ের থেকে বয়সে বড়। ছোটবেলা থেকেই একই পাড়ায় একসঙ্গে বড় হয়েছে ওরা।
তাই মায়ের সঙ্গে ওদের সম্পর্কটা একেবারে তুই-তোকারির। মা-ও ওদের নিজের দাদার মতোই দেখে।
রিংগো আঙ্কেল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সপরিবারে সিঙ্গাপুরে থাকেন। আর বিংগো আঙ্কেল কলকাতার একজন নামকরা শিশু বিশেষজ্ঞ। দুজনেই নিজেদের পরিবার নিয়ে উইকেন্ড ট্রিপে বেড়াতে এসেছিলেন।
ওদের ছেলে-মেয়েরাও এখন বড় হয়ে বিদেশে থাকে।
ছোটবেলায় আমি রিংগো আঙ্কেলের কাছেই বিজ্ঞান বিষয়গুলো পড়তে যেতাম। তাই ওঁদের সবাইকে অনেক দিন পর একসঙ্গে দেখে আমারও বেশ ভালো লাগছিল।
কিছুক্ষণ গল্পগুজব করার পর আমি আর মা নিজেদের রুমে ঢুকলাম জামাকাপড় বদলাতে।
সন্ধ্যেবেলা ফ্রেশ হয়ে রিসোর্টের ভেতর একটু হাঁটাহাঁটি করতে বেরোলাম। ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম, রিসোর্টের ঠিক মাঝখানে বড় একটা খোলা জায়গায় উঁচু করে একটা স্টেজ বানানো রয়েছে ।
বুঝলাম, রাতে বোধহয় এখানেই নাচ-গান হয়। চারপাশ বড় বড় স্পিকার আর রঙিন আলোয় সাজানো।
স্টেজটার সামনে একদল ব্যাচেলর ছেলে-মেয়ে গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। কেউ গিটার বাজাচ্ছিল, কেউ কিবোর্ড, কেউ আবার মাউথ অর্গান।
সবাই মিলে নিজেদের মতো করে গান গাইছিল, হাসছিল আর সন্ধ্যাটাকে জমিয়ে তুলেছিল।
ছুটি কাটাতে সবাই যে যার মতো আড্ডায় মশগুল। স্টেজের ওপর একদল ছেলে-মেয়ে গাইছিল,
— "ঝিংকাচিকা, ঝিংকাচিকা, ঝিংকাচিকা ঝিকাংকা..."
গানের তালে তালে কয়েক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকাকেও কোমর দুলিয়ে নাচতে দেখলাম।
গানবাজনার শব্দ শুনে রিংগো আঙ্কেল আর বিংগো আঙ্কেলও রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। আমাকে দেখে রিংগো আঙ্কেল হেসে বললেন,
— "চল টম, বসা যাক তাহলে!"
আমি রিংগো আঙ্কেল আর বিংগো আঙ্কেলের সঙ্গে স্টেজের ওপর গিয়ে বসলাম। দুজনের হাতে বিয়ারের বোতল। গল্প করতে করতে তাঁরা গানের তালে তালে মাথা আর হাত নাড়ছিলেন।
রিংগো আঙ্কেল যে দারুণ গিটার বাজাতে পারেন, সেটা আমি ছোটবেলা থেকেই জানি।
কিছুক্ষণ পর সোহিনী আন্টি আর মানালি আন্টিও শাড়ি পরে আমাদের আড্ডায় এসে বসলেন।
এদিকে আমার চোখ বারবার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। মনে মনে ভাবছিলাম, মা কি তবে এই ট্রিপটাও ভাস্কর আঙ্কেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেই কাটিয়ে দেবে?
ঠিক তখনই দূর থেকে মাকে দেখতে পেলাম। লাল রঙের শাড়ি আর হাতকাটা ব্লাউজ পরে ধীর পায়ে আমাদের আড্ডার দিকে এগিয়ে আসছে।
মা আমাকে দেখতে পেয়ে আমাদের আড্ডার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। আমি হাত নেড়ে মাকে কাছে আসার ইশারা করলাম।
রিসোর্টের রঙিন আলোয় মাকে যেন অন্য রকম লাগছিল। বাতাসে মায়ের চুলগুলো হালকা উড়ছিল, আর মুখে ছিল এক চিলতে শান্ত হাসি।
মা আমাদের আড্ডায় যোগ দিতেই সোহিনী আন্টি আর মানালি আন্টি মাকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে বলল,
— "এই অনামিকা, চুপ করে বসে আছো কেন? শুরু কর!"
মা আমার দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হাসল। তারপর গানের তালে তালে বসে বসেই দুলতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠল।
সুরটা ছিল ভালোবাসা আর বিষাদের মিশেলে ভরা। মায়ের চোখেমুখে তখন এক বিস্ময়কর প্রশান্তির ছোঁয়া ।
গানবাজনার তালে তালে রিংগো আর বিংগো আঙ্কেলের বিয়ারের বোতলও ধীরে ধীরে খালি হচ্ছিল। সোহিনী আন্টি আর মানালি আন্টির হাতেও বিয়ারের বোতল উঠতে বেশি সময় লাগল না।
বাদ ছিলাম শুধু আমি আর মা। আমিও মায়ের জন্য কিছু খাচ্ছিলাম না, আর মা-ও বোধহয় আমার সামনে বিয়ারের বোতলে চুমুক দিতে একটু ইতস্তত করছিল।
সোহিনী আন্টি আর মানালি আন্টি বারবার মাকে বলছিল,
— "আরে অনামিকা, একটু খাও না!"
মা শুধু হেসে মাথা নাড়ছিল। বোতলটার দিকে একবার তাকাচ্ছিল, আবার আমার দিকেও চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমার সামনে বলে একটু সংকোচই বোধ করছে।
আকাশটা সেদিন মেঘলায় ঢাকা ছিল। চাঁদও মেঘের আড়ালেই মুখ লুকিয়ে রেখেছিল। সেই আবহ দেখেই বোধহয় রিংগো আঙ্কেল আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না।
পাশে গানবাজনা করা ছেলে-মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,
— "কই রে, তোদের গিটারটা আমাকে একটু দিবি বাবা?"
ছেলেটা হাসিমুখে গিটারটা এগিয়ে দিতেই রিংগো আঙ্কেল সেটাকে কোলে তুলে নিলেন। আঙুলের হালকা ছোঁয়ায় তারগুলো মিষ্টি সুরে বেজে উঠল।
তারপর চোখ বুজে গুনগুন করে একটা পুরোনো হিন্দি প্রেমের গান ধরলেন। মুহূর্তেই চারপাশে নস্টালজিয়ার আবেশ নেমে এল।
মায়ের চোখের পলক বারবার নেমে আসছিল। লজ্জায় ও সংকোচে মা বেশিক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিল না।
গানের কলি গুনগুন করতে করতে মায়ের গোল মুখটা হালকা লাল হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে মৃদু এক হাসি লেগে ছিল মায়ের, আর গানের তালে তালে তার ঠোঁট নিঃশব্দে নড়ে উঠছিল।
তার সাথে মায়ের টকটকে লাল লিপস্টিকে মোড়া ঠোঁটের পাঁপড়ি দুখানা বারে বারে কাঁপতে কাঁপতে গানের কলির ছন্দে দুলতে থাকলো।
গান শেষ হতেই রিংগো আঙ্কেল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "এই টম, তুই তো শুনেছি গিটার-ফিটার বাজাস। তা, হবে নাকি একটা?"
আমিও সেদিন রোমান্টিক ফর্মেই ছিলাম , রিংগো আঙ্কেলের থেকে গিটার বোগল দাবা করেই মায়ের দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠলাম ,
— "তোমার জন্যে চিন্তা হয়, তুমিতো ঐশ্বরিয়া নয় ,
শুধুই শুধুই টিনাকে টানার চেষ্টা!—
তুমিই আমার নন্দিনী, তুমিই আমার মামনি
তুমিই আমার হৃদয় হরণী!— "
আমিও গান গাইতে গাইতে মায়ের হরিণী চোখের দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে দিলাম। আলতো করে।
মা মাথা নিচু করে ,কানের পাশে চুলের লক্স ঠিক করতে করতে লজ্জায় নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরলো।
গান-আড্ডার আসর একেবারে জমে ক্ষীর। এমন সময় দেখলাম রিংগো আঙ্কেল উঠে দাঁড়াল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "চল টম, টয়লেটে যাব। আমার সঙ্গে চল।"
আমি আঙ্কেলের পিছু পিছু গেলাম। একটু নির্জনে গিয়ে তিনি লুকিয়ে আনা বিয়ারের বোতলটা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
— "বুঝতেই তো পারছি রে, টম। তোর মা তোর সামনেই বসে আছে। তাই এসব খেতে পারছিস না, তাই তো? নে, এটা রাখ। তোকে তাই এদিকে ডেকে আনলাম।"
রিংগো আঙ্কেল একেবারে গুরুদেব জিনিস। লোকটা যেন অন্তর্যামী। আমার মনের কথাও বুঝে ফেলেছিল। আমিও আর দেরি না করে বিয়ারের বোতলটা সাবাড় করলাম। তারপর দুজনে আবার আসরে ফিরে এলাম।
এসে দেখলাম মা, সোহিনী আন্টি আর মানালি আন্টি—কেউ নেই। শুধু বিংগো আঙ্কেল একা বসে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছে। বুঝতে আর বাকি রইল না,
সোহিনী আন্টি আর মানালি আন্টি মাকে নিয়ে আড়ালে বিয়ার খেতে গেছে।
কিছুক্ষণ পর তিনজন ফিরে আসতেই রিংগো আঙ্কেল হাততালি দিয়ে বলল,
— "গান তো হলো, এবার নাচ হবে না নাকি?"
বলেই সে রিসোর্টের ম্যানেজারকে সাউন্ড বক্স চালু করতে বলল। ম্যানেজারও রিংগো আঙ্কেলের বেশ চেনা পরিচিত ছিল।
আর রিংগো আঙ্কেল রিসোর্টের ম্যানেজার বন্ধু মানিক বাবুকে ডেকে বলল,
— "এই শোন, মানকে! এখানে একটা ব্যাটা-বেটির নাচের প্রতিযোগিতা হবে, বুঝলি? তুই বরং একটা পুরস্কারের ব্যবস্থা কর। তারপর তুই-ই বিচারক। কার নাচে বেশি দম ব্যাটার,
না বেটির—সেটা তুই ঠিক করবি। যার নাচ সবচেয়ে হিট হবে, পুরস্কারটা তার হাতে তুলে দিবি... বুঝলি, মানকে?"
ম্যানেজার মানকে হেসে বলল,
— "সাব্বাস!"
আর রিংগো আঙ্কেল সোহিনী আন্টি, মানালি আন্টি আর মাকে ডেকে বলল,
— "এই যে বেটিদের দল! সবাই রেডি হয়ে যাও। আজ স্টেজ কাঁপিয়ে দিতে হবে!"
তারপর রিসোর্টের ম্যানেজার মানকের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
— "কই রে, মানকে! শুরু কর। রাত যে বয়ে গেল!"
মাকে দেখলাম শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে স্টেজে উঠে দাঁড়িয়েছে। মায়ের দু'পাশে সোহিনী আন্টি আর মানালি আন্টি।
স্টেজের দু'প্রান্তের স্পিকার থেকে তালে তালে লোকগান বেজে উঠল। ঢোলের ছন্দে আর বাঁশির সুরে মুহূর্তেই চারপাশ সরগরম হয়ে উঠল।
মা, সোহিনী আন্টি আর মানালি আন্টি একসঙ্গে নাচ শুরু করতেই দর্শকদের হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল পুরো অনুষ্ঠান।
গানের তালের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কোমর দুলে উঠল, পায়ের থমকও মিলে গেল ছন্দের সঙ্গে। আর সেই নাচে সঙ্গ দিয়ে স্টেজে যেন ছন্দের তরঙ্গ তুলে দিল সোহিনী আন্টি আর মানালি আন্টিও।
চারপাশের রিসোর্টের পর্যটকেরা ধীরে ধীরে স্টেজের সামনে ভিড় জমাতে লাগল। কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউ আবার স্টেজের নিচেই দাঁড়িয়ে গানের তালে কোমর দোলাচ্ছে।
কিন্তু আমার চোখ ছিল শুধু মায়ের দিকেই। লাল শাড়িতে মাকে যেন কমলা সুন্দরীদের চেয়েও বেশি রক্তিম আর মোহময় লাগছিল। গানের কলির ছন্দে নাচতে নাচতে মা মাঝেমধ্যে লজ্জায় হেসে আমার দিকে ফিরে তাকাচ্ছিল। সেই হাসিতে ছিল এক অপরিচিত উষ্ণতা, আবার খানিকটা সংকোচও।
মা মৃগনয়না কাজল চাহুনি দিয়ে মহুল পলাশীর ছন্দে নাচ করতে করতে বারবার আমার দিকে মিষ্টি হেসে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিল, মায়ের ঠোঁটের কোণায় লেগে ছিল তখন স্বর্ণালী ঝলকের কোনো এক চঞ্চলা উর্বশীর শুভ্র দন্ত বিকশিত লাজবতী হাসি।
আর সেদিন আমি মায়ের নৃত্য প্রদর্শন দেখতে দেখতে এটাই ভাবছিলাম , মাকে এত রঙিন, এত হাসিখুশি দেখিনি তো কোনোদিন আগে !
আর আমি ,মাকেই মনে মনে বললাম , এ ত্রিভুবন জুড়ে প্রেম তো শালা অনেকের সাথেই করা যায় , কিন্তু প্রেমে পাগল হওয়া যায় কী ?
এক ও এক মাত্র তোমার প্রেমেই উন্মাদ হওয়া যায় মা । পৃথিবীর শেষ প্রান্তর পর্যন্ত ছোটা যায়। তা এক মাত্র তোমার নিখাদ ভালোবাসার টানেই তো মা ।
মা ,আমাকে তুমি যে তোমার প্রেমে মোহিত, মোহিনী করেই দেওয়ানা বানিয়েই ছাড়লে যে ।
কমলা রাঙা সুন্দরী মায়ের সেই চোখের চাহুনি, যেন বন্য কোনো এক সাঁওতালি মেয়ের নাচের ভঙ্গিমা , আমার হৃদয় সমুদ্রে মা যেন স্বর্ণালী তরী ভাসিয়ে নিয়ে চলেছিল উত্তাল ঢেউয়ের তরঙ্গে।
আমি মাকে দেখে যেন নতুন করেই আরেকবার অবাক হলাম সে আর বলার অপেক্ষা রইল না।
মা যে এত সুন্দর করে, এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে কোমর দুলিয়ে নাচতে পারে, তা তো আমার কল্পনাতেও ছিল না। তুমিই নারী , তুমিই মা। তোমার যে বহু বহু রূপ যে মা ।
মা দের নাচ শেষ হতেই চারপাশে হৈচৈ আর হাততালিতে যেন রিসোর্ট মুখর হয়ে উঠল। দর্শকদের উচ্ছ্বাসে গোটা পরিবেশ জমে গেল।
কেউ কেউ আবার চিৎকার করে উঠল,
— "আর একটা! আর একটা!"
আবার কারও গলা ভেসে এল,
— "দিদিভাইদের আরেকটা নাচ হয়ে যাক!"
এদিকে মাদের নাচ শেষ হতেই রিংগো আঙ্কেলের ইজ্জত কা ফালুদা হওয়ার জোগাড়। বেটিদের নাচের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এবার কোন কোন ব্যাটা স্টেজে নামবে?
আমি, রিংগো আঙ্কেল আর বিংগো আঙ্কেল দ্রুত একটা প্ল্যান করে ফেললাম। নাচ কিছুতেই থামানো যাবে না—যা-ই হোক, লড়াই চলবে। বেটিদের হাতে এত সহজে পুরস্কার তুলে দেওয়া যাবে না।
আমরা তিনজন স্টেজে উঠে দাঁড়ালাম। মাঝখানে রিংগো আঙ্কেল, দু'পাশে আমি আর বিংগো আঙ্কেল।
আমাদের মাথায় লাল ফেটি, আর কোমরে কষে বাঁধলাম গামছা।
স্টেজে উঠেই রিংগো আঙ্কেল ম্যানেজার মানকের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
— "কই রে, মানকে! বাজা বক্স!"
স্পিকারে বাজতে শুরু করল এক ঝাঁঝালো লোকগান।
শালা, আমি নাচের মাথামুণ্ডু কিছুই জানি না। গান যাই বাজুক, আমি আমার মতো হাত-পা ছুড়ে, নিজের ছন্দেই কোমর দোলাতে লাগলাম। আমাদের ক্যাপ্টেন রিংগো আঙ্কেলের একটাই নির্দেশ,
"নাচ যেন কোনোভাবেই না থামে!"
আড়চোখে দেখি, রিংগো আঙ্কেল আর বিংগো আঙ্কেলও যে যার মতো নেচে চলেছে। কারও নাচের সঙ্গে কারও নাচের কোনো মিল নেই। মনে হচ্ছিল, তিনজন তিনটা আলাদা গানের তালে নাচছি!
মায়ের দিকে তাকাতেই দেখি, মা, সোহিনী আন্টি আর মানালি আন্টি পেটে হাত চেপে হেসে কুটোপাটি।
মা আমার দিকে তাকিয়ে জিভ বের করে ভেংচি কেটে চলেছে ।
থাম্বস ডাউন দেখিয়ে এমন একটা মুখভঙ্গি করল, যেন বলছে, "হচ্ছে না... হচ্ছে না!"
ঠিক তখনই নাচতে নাচতে রিংগো আঙ্কেল ধপাস করে স্টেজে পড়ে গেল।
ক্যাপ্টেন ফল ডাউন! সর্বনাশ!
কিন্তু মিউজিক থামেনি।
আমি আর বিংগো আঙ্কেল একবার একে অপরের মুখের দিকে তাকালাম। ক্যাপ্টেনকে তুলব, না নাচব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না । কিন্তু ক্যাপ্টেনের আদেশ মনে পড়তেই দাঁতে ঠোঁট চেপে নেচেই চললাম।
আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি, হাসতে হাসতে মা মাটিতেই বসে পড়েছে। তার ঘাড়ের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সোহিনী আন্টি আর মানালি আন্টি। তিনজনের হাসি যেন থামার নামই নিচ্ছে না।
এদিকে রিসোর্টের অন্য পর্যটকেরা আমাদের ভুলভাল নাচ আর রিংগো আঙ্কেলের বিয়ারের লোড সামলাতে না পেরে স্টেজের ওপর চিৎপটাং হয়ে পড়ার দৃশ্য দেখে হাসতে হাসতে কুটোপাটি খাচ্ছে।
রিংগো আঙ্কেলকে স্টেজে পড়ে যেতে দেখে তাঁর ম্যানেজার বন্ধু মানকেও দৌড়ে স্টেজে উঠে এল।
অথচ আমি আর বিংগো আঙ্কেল হাত-পা ছুড়ে নেচেই চলেছি। বক্স বেজে চলেছে। থামতেই পারছিলাম না।
রিংগো আঙ্কেল কে ম্যানেজার মানকে ,স্টেজের উপর টানা হ্যাঁচড়া আরম্ভ করে দিয়েছে।
হঠাৎ দেখলাম, আমাদের গুরু আবার ফর্মে ফিরে এসেছে। কয়েক সেকেন্ড পর রিংগো আঙ্কেল নিজেই উঠে বসলেন। যেন কিছুই হয়নি।
দিলেন বসে বসেই ।
রিংগো আঙ্কেলকে স্টেজে বসে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করতে দেখে মনে হলো, পাড়ার দুর্গাপুজোর ভাসান-ড্যান্স শুরু হয়ে গেছে।
রিংগো আঙ্কেল দমে যাওয়ার পাত্র নয়। ডাণ্ডা টুডুং—টুডুং-ঢিচকাও এর তালে বসে, শুয়ে, একেবারে নাগিন ড্যান্সও ঝেড়ে দিল মুহূর্তের মধ্যে।
তারপর একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে ম্যানেজার বন্ধু মানকেকে দেখে কোমর দোলাতে দোলাতে গাইতে শুরু করল,
— "নাচ রে পাগলা, নাচ রে মানকে! তুলে তুলে.!"
মানকে-ও আমাদের সঙ্গে স্টেজে নাচতে শুরু করল।
শেষে রিংগো আঙ্কেল আর বিংগো আঙ্কেল আমাকে চ্যাংদোলা করে কাঁধের ওপর তুলে নিল। আমি দু'হাত ছড়িয়ে, দু'পা ঝুলিয়ে ওদের কাঁধে বসেই হাত-পা ছুড়ে নাচতে লাগলাম।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন হাততালি আর হইহুল্লোড়ে পুরো রিসোর্ট মাথায় তুলল।
যাই হোক, শেষমেশ ঘেমে একেবারে ঝোলঝোল হয়ে কোনোরকমে স্টেজ থেকে নামলাম।
স্টেজ থেকে নেমেই দেখি, রিংগো আঙ্কেলের পড়ে যাওয়া নিয়ে মা আর মানালি আন্টি ওনাকে নিয়ে খিল্লি উড়াচ্ছে। সেটা দেখে রিংগো আঙ্কেল বুক ফুলিয়ে বলল,
— "ওটা তো আমি ভড়কি দিয়েছিলাম, আর কী!"
এদিকে ম্যানেজার মানকে মাইক হাতে নিয়ে হাসিমুখে ঘোষণা করল,
— "আজকের ব্যাটা আর বেটিদের নাচের প্রতিযোগিতায় দু'দলই যুগ্ম বিজয়ী!"
ঘোষণা হতেই চারদিক হাততালি আর হইহুল্লোড়ে মুখর হয়ে উঠল। রিংগো আঙ্কেল সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বলল,
— "দেখলি তো! শেষ পর্যন্ত ব্যাটারাও কম যায় না!"
নাচ-গান আর হাসি-ঠাট্টার পর আমি আর মা রুমে ফিরে এলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে রাতের দিকে রিসোর্টের ক্যান্টিনে ডিনার সেরে ফেললাম ।
ক্রমশ...