কুহেলী - এক সতী বিধবার অজানা গন্তব্য (সিরিজ) - অধ্যায় ৪
(4)
কন্ডাক্টর ভাড়া চাইতেই কুহেলীর মনে পড়লো সে তো কিছুই নিয়ে আসেনি বাড়ি ছেড়ে আসার সময়, টাকা তো দূর, একটা কয়েনও সঙ্গে নেই তার। সমস্যা শুধু এখানেই নয়, সে কোথায় যাচ্ছে তাও যে সে জানে না! কোথায় তার গন্তব্য, কোথায় যে সে চলেছে, সে তো এতো ভেবে পথে নামেনি, চাই সে শুধু একটুখানি শান্তির সন্ধান।
কি হল দিদিভাই, বের করুন।
কন্ডাক্টর তাড়া লাগালো। এত ভিড়ের মধ্যে একজনের পেছনে এতো সময় নষ্ট করা কি যায়! কুহেলীর সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা যুবক, শান্তনু, হয়তো কুহেলীর মুখের ভাব দেখে তার মনের ভেতরটা কিছুটা আঁচ করতে পারলো। সে পকেটে হাত ঢুকিয়ে টাকা বের করে কন্ডাকটরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
মতিপুর...দুটো কাটুন, আমরা একসাথেই আছি।
কুহেলী চমকে শান্তনুর দিকে চাইল। শান্তনু মুচকি হেসে কন্ডাকটরের কাছ থেকে টিকিট নিল। কন্ডাক্টর চলে যেতে কুহেলী কিছুটা অস্বস্তি নিয়েই শান্তনুকে বললো,
আপনি এটা কি করলেন? আমি তো আপনার কাছ থেকে সাহায্য চাইনি আর তাছাড়া আমি তো মতিপুরেও যাবোও না।
শান্তনু আবার সেই মুচকি হেসেই বললো,
জানি তো, কন্ডাক্টর এতজনের সামনে আপনায় দুটো কথা শোনাতো, তা কি আমার ভালো লাগতো বলুন। আর তাছাড়া আপনি কোথায় যাবেন না যাবেন, সেটা তো আপনার হাতেই আছে, আমি তো আপনাকে জোর করিনি।
কুহেলী এই কথায় লজ্জিত হলো কিছুটা। সত্যিই তো, ছেলেটা তো এমন কিছু করেনি, বরং এই খারাপ পরিস্থিতিতে তার পাশে দাঁড়িয়েছে... যেমনটা দাঁড়াতো তার স্বামী শান্তনু। তাই খানিকটা লজ্জিত হয়েই সে বলল,
আমায় ক্ষমা করবেন, আমি সেভাবে বলিনি, আসলে আমি টাকা আনতে ভুলে গিয়েছি, তাই...।
ঠিক আছে, আমি ভদ্র ধনী মহিলাদের কথায় কিছু মনে করিনা। আপনাকে দেখেই মনে হচ্ছে আপনার কোন বাড়ির মেয়ে। আসলে আমরা খুব গরীব, তাই সব কথাই গা করিনা, অভ্যেস হয়ে গিয়েছে।
শান্তনুর এই কথায় কুহেলীর একেবারে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হল। সে দ্রুত বলে উঠলো এবং তাদের কথোপকথন চলতে থাকলো,
প্লিজ, আমায় ওরকম ভাববেন না, আজ যদি আপনি আমার পরিস্থিতিতে থাকতেন...তাহলে হয়তো!
পরিস্থিতি?
হুমম।
আপনার চেহারা দেখেই বুঝেছিলাম আপনি কষ্টের মধ্যে আছেন, যদি বলতে অসুবিধা না হয়, তবে বলতে পারেন। দেখুন এই বাস থেকে যখন নেমে যাবো, তখন না আপনি আমায় চিনবেন, না আমি আপনায়, তাই ভেবে নিন না যে ক্ষনিকের এক বন্ধুর কাছে মনের সব কথা বলে নিজেকে কিছুটা হালকা করলেন। আমি আর যাই হই, আপনার কোনো ক্ষতি করবো না। আর ধনীদের কাছে গরীবের মূল্যই বা কতখানি!
আপনি বার বার আমায় এভাবে কথা বলছেন কেন বলুনতো...আমায় কি সেরকম মেয়েদের মতো অহংকারী মনে হচ্ছে?
আচ্ছা ঠিক আছে, আর বলবো না এভাবে। বলুন দেখি এবার, কি হয়েছে আপনার জীবনে...।
যখন মানুষ দুঃখ পায়, তখন সে ভাবে সেই জগতের সবচেয়ে দুঃখী, কিন্তু চারিদিকে তাকিয়ে মনে হয় না, দুঃখ তো আছেই, চারপাশে, সমান ভাবে ছড়িয়ে, সবাই তার হাতে ধরা সুতোয় বাঁধা। কেউ পার পায় না! সেটা আর নাইবা জানলাম।
আপনি তো বেশ ভালো কথা বলেন। এক কাজ করা যাক, মতিপুর এলে দুজনেই নেমে পড়ি। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি সকাল থেকে না খেয়ে আছেন, বাস থেকে নেমে একটা ভালো খাবারের হোটেলে ঢুকে দুজনে কিছু খেয়ে তারপরে আপনার সব কথা শুনবো। তারপর আপনি যেখানে বলবেন সেখানকার বাসেই নাহয় আপনায় তুলে দেবো। আপনি চলে যাবেন আপনার গন্তব্যে, আমি আমার।
কুহেলী শান্তনুর দিকে তাকিয়ে থাকে। এই সকাল থেকে না খাওয়ায় ব্যাপারটা ছেলেটা বুঝলো কি করে! তার মনে পড়ে গেল তার স্বামীও যখন দেখতো সে খাইনি, এভাবেই স্নেহ ভরা গলায় তাকে খাবার খাওয়ার কথা বলতো, আজ সে কতো দূরে! কিন্তু এই ছেলেটাও যে তার মতো করেই তার মনের কথা বুঝতে পারছে!
কি হলো, নামবেন, মতিপুর চলে এলো প্রায়।
শান্তনুর কথায় চমক ভাঙলো কুহেলীর। সে কি বলবে এর উত্তরে ভেবে পেল না। বাস এসে দাঁড়ালো মণিপুর স্টপেজে, তখন শান্তনু একপ্রকার তার অভিভাবকের মতো করেই তার হাত ধরে বললো,
আসুন, নামি।
বলে শান্তনু কুহেলীর হাত ধরে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল গেটের দিকে।
(চলবে)