চারুলতা (উপন্যাস) (সম্পূর্ণ) - অধ্যায় ২

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-75197-post-6307812.html#pid6307812

🕰️ Posted on Mon Sep 7 2026 by ✍️ কামসম্রাট (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1299 words / 5 min read

চারুলতা লেখক - কামসম্রাট  পর্ব - ২ ইন্টারভিউ দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ১১ টা বেজে গেল। সাইকেলটা উঠোনের এক কোনে রেখে দেখি মা বারান্দায় লন্ঠন জ্বালিয়ে মুখ নামিয়ে কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। আমি উঠোনে অন্ধকারের দিকটায় সাইকেল রাখছিলাম বলে মা দেখতে পায়নি আমায়। বোধহয় বাবা আর লতা শুয়ে পড়েছে নিজেদের ঘরে। আমি কাছে যেতেই মা বারান্দা থেকে উঠে চোখের জল মুছে মুখে হাসি ফুটিয়ে আমার কাছে এসে জিগ্যেস করলো, - ফিরেছিস সোনা....তোর পায়ের ব্যাথাটা আর নেই তো? এই হলো আমার মা! ইন্টারভিউ কেমন হলো, চাকরি হবে কিনা, এসব নয়, নিজের সন্তান কেমন আছে, এই তার একমাত্র কৌতূহল! আমি আমার ইন্টারভিউয়ের জন্য আগে থেকেই উত্তেজিত হয়ে ছিলাম। তাই দুই হাতে মায়ের কাঁধ দুটো ধরে হেসে বললাম, - মা আমার ব্যাথা নেই, তবে ইন্টারভিউ খুব খুব খুব ভালো হয়েছে মা.... খুব ভালো হয়েছে! মায়ের চোখ জলে ভরে আসে। আমি মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললাম, - আয় কেঁদো না মা, এই চাকরিটা হয়ে গেলে দেখবে আর আমাদের কোনো দুঃখ থাকবে না... তোমার মুখে আমি হাসি ফোটাবো। বলে মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম, - সেই সকালের পর আর কিচ্ছু পেটে দিইনি মা, রান্না করেছো? মা হাসতে হাসতে আমায় নিয়ে গেল বারান্দায়। তারপর বললো, - আমি তোর জন্য পুকুর থেকে জল এনে রেখেছি বালতিতে ওখানে, হাত মুখ ধুয়ে আয়, আমি খেতে দিচ্ছি। এই মায়ের কোলে যেন বারে বারে ফিরে আসি! কাল পুকুরে পড়ে গিয়েছিলাম বলে আজ আমি বাড়ি ফেরার আগেই মা আমার জন্য জল এনে রেখেছে যাতে আমায় পুকুরের পিচ্ছিল ঘাটে আর না যেতে হয়। কত কিছু নিয়ে মা তুমি ভাবনায় থাকো.... সংসারের দারিদ্র, স্বামীর অপমান, মেয়ের কুকথা আর ছেলের চিন্তা! এই এক শরীরে আর কত কি বয়ে বেড়াবে মা তুমি!  আমি ব্যাগ রেখে খালি গায়ে একটা গামছা পরে গেলাম উঠোনে। সেখানে মায়ের আনা বালতি ভর্তি জল নিয়ে হাত মুখ ধোয়া নয়, একেবারে স্নান-ই করে নেবো ভাবলাম। এই গরমে সারাদিনের ঘাম বসে আছে শরীরে, তার ওপর স্নান করে গা ঠান্ডা না করলে ঘুম আসবে না আমার। আমি গায়ে সাবান ঘষতে ঘষতে মাকে দেখতে লাগলাম। মা তখন বারান্দায় বসে দুটো থালায় ভাত তরকারি সাজাচ্ছে। বুঝলাম মাও খায়নি এখনও। আজ অবধি কোনোদিন দেখলাম না আমায় খাওয়াবার আগে মা খেয়ে নিয়েছে। মায়ের স্নেহ যে এমনই! আমি মায়ের দিকে তাকিয়েই ছিলাম, মা একবার আমার দিকে চেয়ে হাসলো , তারপর আবার খাবারে মন দিলো।  মা একটা হালকা হলুদ রঙের শাড়ি পরেছে আজ। ঘোর শ্যামাঙ্গিণী মা, তাই এই হলুদ রঙের শাড়িতে মাকে সামান্য লন্ঠনের আলোয় অসম্ভব সুন্দরী দেখাচ্ছে। যেন এক ডানা কাটা পরী আকাশ ছেড়ে গাঁয়ের এক ছোট্ট মাটির ঘরে নেমে এসে এক বাঙালী নারী রূপে এই সংসার সামলাচ্ছে, অবিরাম, কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই। চুল খোলা রেখেছে মা, সেগুলো পিঠ ও বুকের ওপর এদিক ওদিক দুলছে মায়ের নড়াচড়ায়। মায়ের মুখে যে দুঃখী ভাবটা বাড়ি ফিরে দেখছিলাম, তা যেন অদৃশ্য হয়ে এক সারল্য ভরা প্রশান্তি ফুটে উঠেছে মায়ের সারা মুখমন্ডলে। এই মাকেই আমি দেখতে চাই, চোখের জলে নয়, দুঃখের বন্ধনে নয়, সুখ ও হাসির পরশে মায়ের জীবনকে আমি পরিপূর্ণ রূপ দিতে চাই....দেবো, আমি দেবো একদিন! যখন খাওয়া শেষ হলো, দেখলাম মা নিজের ঘরে না গিয়ে বারান্দার এক কোনে বসে আছে। আমার দিকে চেয়ে বললো, - সোনা তুই গিয়ে ঘুমিয়ে পড়, এই ক্লান্ত শরীরে আর দাঁড়িয়ে থাকিস না। আমি বললাম, - তুমি ঘুমোবে না? এইখানে যে বসে গেলে? মা মাথা নীচু করে আনমনে কি ভাবতে ভাবতে বললো, - নারে, আমার আজ ঘুম পাচ্ছে না। মাথাটা ধরে আছে, একটু বসি, কমে গেলেই চলে যাবো। আমি বুঝলাম মায়ের এই কথা সত্যি নয়। মাকে এভাবে আমি এর আগেও বহুবার সবার আড়ালে সরে এসে একলা নির্জনে বসে থাকতে দেখেছি, বসে বসে অন্যকে দোষ না দিয়ে নিজের দোষকে খুঁজতে দেখেছি। তাই কাছে গিয়ে মায়ের পাশে বসে বললাম,  - কি হয়েছে সত্যি করে বলোতো মা....। মা চুপচাপ। আমি আবার এক কথা জিগ্যেস করাতে মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো তার কোলের ওপর। আমি এবার মায়ের হাত ধরে বললাম, - আমি তো তোমার ছেলে মা, আমিই তো সব, তুমি আমাকেই বলবে না? তারপর মায়ের ঠোঁটে কথা ফুটলো। যা বললো তা সংক্ষেপে এরকম, আজ বিকেলে লতা কলেজ থেকে বাড়ি ফেরেনি দেখে বাবা গিয়েছিল খুঁজতে। কিছুদূর গিয়ে বাবা দেখতে পায় সেখানে একটা নির্জন বড়ো দীঘির পাড়ে গাছতলায় লতা একটা ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় বসে। ব্যস্। পাশেই একটা ছোটো খেজুর গাছ ছিল। তার ডাল ভেঙে পাতা ছাড়িয়ে মারতে মারতে তাকে বাড়ি নিয়ে আসে বাবা। তারপর তাকে তার ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়। এখানেই শেষ নয়, বাবার রাগ এবার সবে শুরু হয়। লতার ওপর থেকে সব দোষ তুলে বাবা মায়ের ওপর তা চাপিয়ে দিয়ে অত্যন্ত খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করে মাকে একটা চড় মারে এই বলে যে, মা নাকি নিজের মেয়েকে মানুষ করতে পারেনি, মা নাকি ‌'মা' হওয়ার যোগ্যই নয়! তারপর থেকে বাবা তার ঘরে মাকে আর ঢুকতে দেয়নি। মা...সে তো আর রাগ করে থাকতে পারে না স্বামীর ওপরে, না মেয়েকে না খাইয়ে শাস্তি দিতে পারে! সম্পূর্ণ বিনা দোষে বাবার কথার আঘাত ও চড় সহ্য করেও মা রান্না করেছিল, বাবার ঘরে গিয়ে খাবার দিয়ে এসেছিল, লতার ঘরে তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে খাইয়ে দিয়ে এসেছিল। তারপর থেকেই ওভাবে বারান্দায় আমার অপেক্ষায় বসেছিল। সেই বিকেলের পর থেকে বাবা আর একটাও কথা বলেনি মায়ের সঙ্গে। যা ভেবেছিলাম তাই হলো, লতার সব কান্ড বাবা জেনে গেলো। এই ঘটনা আমায় আঘাত দেয়নি, লতা বড়ো হয়েছে, প্রেম করছে, আর তা একদিন জানাজানি হবেই, এটা স্বাভাবিক, আঘাত পেলাম মায়ের অপমানে! এই সংসারের সব ভুল, সব খারাপ আর সব দূর্ভাগ্যের জন্য মাকেই দোষী হতে হয় বারবার। আমি আর সহ্য করতে পারলাম না! কতোবার, কতোবার আমি আমার প্রাণপ্রিয় মায়ের চোখের জল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবো! কতোবার তাকে মিথ্যা সান্তনা দেবো যে সব ঠিক হয়ে যাবে, বাবা শুধরে যাবে! কতোবার তার দুঃখে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলবো চোখের জল তোমার এতো অল্প মূল্যের নয় মা! আমার রাগ প্রবল, শুধু প্রকাশটা কম হয় মাত্র, কিন্তু যখন হয়, তখন এর তাপ যে কেউ সহ্য করতে পারে না! আমি মাকে ওখানে বসিয়ে রেখে বাবার ঘরের দরজা সজোরে ধাক্কা দিয়ে দড়াম করে খুলে ভেতরে ঢুকে 'বাবা' বলে চিৎকার করে উঠলাম। বাবা ঘুমিয়ে ছিল। ঘুমের মধ্যে এতো চিৎকারে ভয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো। আমার‌ চোখ দিয়ে তখন আগুনের হলকা বেরিয়ে আসছে। আমি ক্রুদ্ধ স্বরে বললাম তাকে, - তুমি মায়ের গায়ে হাত তুলেছো? বাবার ঘুমের ঘোর তখন আমার চিৎকারে ভঙ্গ হয়ে রেগে গিয়ে উত্তর দিলো, - তুলেছি। ভুল করলে আরও মারবো। এই কথায় আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো। মা কি কোনো ভৌত বস্তু নাকি যে রাগ হলেই তাকে ছুঁড়ে ফেলা যায়! এই তার ভালোবাসা নিজের স্ত্রীর জন্য! নাকি নিজের যৌবন শেষ হয়ে গেছে বলে মাকে একজন সংসার চালানো দাসী ভেবে ফেলেছে সে! আমি গর্জে উঠলাম, - না, আর নয়, আর একটা আঘাতও নয়। এই শেষ! বলে দরজা টা আবার দড়াম করে ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম বাবার ঘর থেকে। বাইরে এসে দেখি মা চোখে জল নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাবার ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমি মায়ের কাছে গিয়ে মায়ের হাতটা ধরে বললাম, - চলো, আজ থেকে তুমি আমার কাছে শোবে। বাবার সঙ্গে তোমায় আমি আর থাকতে দেবো না।  মা আমায় আটকায়, কাঁদতে কাঁদতেই বলে, - ওরকম বলিসনা বাবা, আমি দোষ করেছি বলেইতো মেরেছে। বারে, ভুল করলে তো তাকে শাস্তি দিতে হবে, নয়তো যদি আমি বারে বারে ভুল করি! - না মা, ভুল তুমি নিজে করোনি, শুধু তোমার একটাই ভুল....সরল মন নিয়ে সবার কথা মেনে নেওয়া আর সব.... সবকিছু সহ্য করে নেওয়া! তবে আর, আর আমি তোমায় কষ্ট পেতে দেবোনা মা! - এরকম করিস না বাবা, আমি আজ রাতে তোর বাবার কাছে না গেলে যে তোকে ও মেরে শেষ করে দেবে কাল! আমি থামলাম। শুধু থামলাম না, আমি অবাক হলাম। মায়ের 'রাতে বাবার কাছে যাওয়া' - এই কথাটা ঠিক স্বাভাবিক ভাবে আমার মনে প্রবেশ করলো না। রাতে যাওয়া মানে? রাতে মা বাবার কাছে গেলে বাবা আর আমায় মারবে না? কেন? মা কোন পথে বাবার রাগ ঠান্ডা করবে? মা কি করতে চলেছে? মা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে নিঃশব্দে বাবার ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো। আমি নিজের ঘরে চলে এলাম। আর কি চিন্তা করবো? কিইবা বাকি আছে চিন্তা করার? লন্ঠনের আলো নিভিয়ে দিয়ে জানালার কাছটায় এসে শুয়ে পড়লাম। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আজ পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদ। তার রূপোলী আলো আমার ঘরে ঢুকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক মায়াবী আবহ সৃষ্টি করেছে। আমি ওই চাঁদের দিকে চেয়ে কত কি ভাবতে লাগলাম! (ক্রমশ....)