চারুলতা (উপন্যাস) (সম্পূর্ণ) - অধ্যায় ৪৯
চারুলতা
লেখক - কামসম্রাট
পর্ব - ৪৭(অন্তিম পর্ব)
- দাদু......ও দাদু..... গল্প শেষ?
- হ্যাঁ দাদুভাই, গল্প শেষ হলো!
হ্যাঁ চারুলতার কাহিনী এখানেই শেষ! নাতিকে বললাম চারুলতার আংশিক কাহিনী। আর তোমাদের বললাম সম্পূর্ণ কাহিনী! এই হলো আমার স্ত্রী....আমার মা.....চারুলতার গল্প! আজ এই কাহিনী বলে আমার এই বৃদ্ধাবস্থায় মনটা হালকা হলো।
চারু চেয়েছিল সে না থাকলেও যেন আমি সন্তানকে নিয়ে বাঁচি...! আমি এতদিন তার অনুপস্থিতিতে সেইভাবেই বেঁচে এসেছি। সে বলেছিল যেন আমি নিজের খেয়াল রাখি....আমি খেয়াল রেখে এসেছি! যেমনভাবে সে তার অনুপস্থিতিতে সাজাতে চেয়েছিল আমার জীবনকে, আমি তেমনভাবেই সাজিয়ে এসেছি।
কিন্তু....আর যে পারিনা...! লাঠি হাতে চলতে হয়! ভালোভাবে দাঁড়াতে পারি না আর! শীর্ণ চেহারাই চোখে চশমা পরে ঝুলে পড়া গায়ের চামড়ায় একবার হাত বুলিয়ে নিলাম। সব হারিয়ে গেছে, চলে গেছে যৌবন, ছেড়ে গেছে চারু, রয়ে গেছি কেবল আমি! চারুলতাকে দেখার জন্য মনটা কেঁদে উঠলো! এবার বুঝি আমারও যাওয়ার সময় হয়েছে!
চারুলতা আজ নেই আমার সঙ্গে! আমি জানি আজ আমি যদি বুক ফাটিয়ে চিৎকারও করে বেড়ায়, তবুও তার ডাক আমার কানে আর আসবে না! কি নিষ্ঠুর প্রকৃতির এই খেলা! নিজের কাছের মানুষটাকে খুঁজে বেড়ালেও আর তার দেখা পাবো না!
চারুলতা চেয়েছিল যেন আমি শেষ বয়সে আমাদের ছোট্ট গাঁ গোবাদায় আমাদের বাড়িতে ফিরে যাই! এটাই ছিল তার শেষ অনুরোধ! সে এটা বলেছিল কারণ সে যে সেখানেই আমার প্রেমে পড়েছিল একদিন। তাই সে চেয়েছিল শেষ বয়সে আমি যেন তার প্রেমের পরশেই হারিয়ে যেতে পারি একদিন! সে যে কতখানি ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিল, সে যে কতখানি ভালোবাসতে পেরেছিলো আমায়, সে যে কতখানি যত্ন করতে পেরেছিলো আমায়, প্রতি পদে তার সেই মধুর স্মৃতি এসে আমায় তা কাঁদিয়ে দিয়ে যাচ্ছে!
- হ্যাঁ চারু....আমি....আমি যাবো সেখানে....আমি আসছি.....আমি আসছি চারু...........!!!!
মনটা হু হু করে উঠলো।
বেরিয়ে পড়লাম! অনেকটা পথ যেতে হবে। আমার গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বললাম,
- চলো এবার!
পেছন থেকে পল্লব ডেকে উঠলো,
- বাবা, কোথায় যাচ্ছো?
- গোবাদায় বাবা....আর আমায় ডাকিস না....আমায় যে যেতে হবে রে....তোর মায়ের এটা শেষ ইচ্ছা ছিল....!
গাড়িটা যখন গোবাদায় এসে ঢুকলো তখন বিকেল। আমাদের সেই বাড়ির বাইরে এসে গাড়িটা দাঁড়ালো। সেই যে চারুকে নিয়ে গোবাদা ছেড়েছিলাম, তারপর প্রথমবার এলাম আবার। আমি না এলেও লোক লাগিয়ে বাড়িটাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। মাটির বাড়ি ভেঙে পড়ায় একতলা পাকা বাড়ি বানিয়েছি, যে তিনটা ঘর ছিল, তেমনি তিনটা ঘর রেখেছি, যে গোয়ালঘর ছিল, তা পাকা করেছি, যেমন উঠোন ছিল, তেমনি রেখেছি, পাঁচিল ইঁটের করেছি। শুধু মাটি থেকে দালান হয়েছে, ভেতরটা একই রয়েছে। আমাদের প্রেমের স্মৃতি জড়িয়ে আছে যে সর্বত্র!
গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে হাঁটু আর কোমরে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করলাম। বয়স হয়েছে অনেক। হাড়গুলোর বয়স হয়েছে! চারুলতার স্মৃতি ভরা এই বাড়িটিকে দেখে দ্রুত গাড়ি থেকে নামতে গিয়েছিলাম নিজেকে সেই ২০ বছরের যুবক মনে করে, যখন আমি প্রথম চারুলতার প্রেমে পড়েছিলাম। আর এই ব্যাথা আমায় মনে করিয়ে দিলো সেই সবই শুধুমাত্র আমার স্মৃতি....আমি আর ২০ বছরের সেই যুবক নই, এক বৃদ্ধ, আর চারুও সেই বাড়িতে নেই....! সেই ব্যাথা আমার কানে নিষ্ঠুর হাসি হেসে যেন বলে গেল,
- চারুলতা আর নেই চয়ন! তাকে....আর....দেখতে পাবে না!
ভেতরটা মুচড়ে উঠলো। চোখের সাদা পাতাগুলো ভিজে এলো!
ড্রাইভার থাকতে চেয়েছিল, আমি তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিই। এই গাঁ কত বদলে গেছে! মাটির বাড়িগুলো আর নেই...এখন সবই পাকা বাড়ি! বাস, রিক্সা, অটো, বাইক চলেছে পিচ রাস্তার ওপর দিয়ে। মোবাইল হাতে যুবক যুবতীরা হেঁটে বেড়াচ্ছে। ইলেকট্রিসিটি এসে গেছে। আর এটা গাঁ নেই, গ্রামও নেই, আধা শহরের ছায়া লেগে গেছে এখানে। গোবাদা বদলে গেছে! চোখটা ভিজে এলো। চাইলেও আর সেই দিনগুলো ফিরে পাবো না!
বাড়ির উঠোনটায় এসে দাঁড়ালাম। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা সেই উঠোন, গোয়ালঘরটা একপাশে দাঁড়িয়ে, যেখানটায় রিনু আর মিনু দাঁড়িয়ে খড় চিবাতো একসময়। আমার স্ত্রী.... চারুলতা....আমার মায়ের নিজের হাতে লাগানো গাছগুলো এখনও রয়ে গেছে....তারা মায়ের হাতের ছোঁয়া বয়ে বেড়াচ্ছে! চোখে পড়লো আমাদের ঘরগুলোর দিকে। তিনটি ঘর একলা দাঁড়িয়ে রয়েছে....হয়তো আমারই ফেরার প্রতিক্ষায় এতোদিন বসে আছে!
আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। এইতো লতার ঘর। ভেতরে একটা খাট। পাশের ঘরটাই বাবার। এখানে ঠিক জানালার পাশটায় বসে বাবা বিড়ি টানতো। বিড়ির ধোঁয়ার গন্ধটা আজও যেন খানিক ভেসে এলো! তার পাশের ঘরটাই আমার...না আমার নয়...আমাদের...আমার আর মায়ের!
ভেতরে ঢুকলাম। খাটটা রয়েছে। ওইতো জানালাটা। ধুলো মাখা বিছানাটায় বসলাম। এই বিছানায় কত কতবার মাকে নিয়ে সময় কাটিয়েছি! মা আমার বুকে মুখ গুঁজে তার সারাদিনের মনের কথা খুলে বলতো আমায় স্কু/ল সেরে বাড়ি ফেরার পর। কত রাত এই জানালায় দুজনে বসে থেকে বাইরের জ্যোৎস্নালোকিত প্রান্তরে তাকিয়ে থেকেছি....তা এখন আর ঠিকমতো মনেও পড়ে না!
আজ এখানে আসার সময় বুকের বাঁদিকটায় একটা চিন চিন ভাব অনুভব করেছিলাম। সেই ব্যথাটা এখনও মাঝে মাঝে করছে। বুকে হাত দিয়ে বসে ছিলাম, হঠাৎ এমনসময় একটা সুস্বাদু রান্নার গন্ধ আমার নাকে এসে ধাক্কা দিয়ে গেল। কে রান্না করছে? আমার মা? আমার চারুলতা?
লাঠিতে ভর দিয়ে বারান্দার দাওয়ায় এসে দাঁড়ালাম। উনুনের কাছটায় তাকাতেই দেখলাম...না.... সেখানে কেউ নেই....মা বসে আর রান্না করছে না! পাশের বাড়ি থেকে গন্ধটা আসছে বোধহয়!
ভেতরটা একাকীত্বের বেদনায়, মাকে আর একটিবার শেষবারের মতো দেখার জন্য আকুল হয়ে কেঁদে উঠলো।
- মা.... একটিবার দেখা দাও মা.....আমি আর একটিবার তোমার সেই মায়াবী মুখখানি দেখতে চাই গো....এসো মা.....ও মা ....!!!
কোনো সাড়া এলো না!
মা বেশিরভাগ সময়ই এই দাওয়ায় বসেই কাটাতো। আমিও বসে পড়লাম এখানটায়। আহ্! মায়ের শরীরের গন্ধ আজও যেন এখানটায় অবশিষ্ট রয়ে গেছে! এই তো মায়ের সেই চেনা গন্ধ আমি পাচ্ছি! এই তো ....এই তো!
ঘুমটা ভেঙে গেল। চারপাশ অন্ধকারে পরিপূর্ণ! আমি দাওয়ায় বসে মায়ের স্মৃতি হাতড়েই দেয়ালে ঠেস দিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই! এই বয়সে এমন ঘোর প্রায়ই আসে! চোখ মেলে দেখলাম চারপাশ অন্ধকার! কিন্তু আর আমার ভয় নেই। বিড়বিড় করে উঠলাম,
- আমার মা....মা গো....ও মা.....!!!!!
লাঠিতে ভর দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে আবার আমার ঘরটাই গিয়ে ঢুকলাম। বিছানায় বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম একদৃষ্টিতে, দেখতে পেলাম পরিবর্তনের পরের গোবাদাকে এই রাতের অন্ধকারে। আজ আর আমাদের সময়ের মতো গাছপালা ও নির্জনতা নেই। গাছপালা কেটে পাকা বাড়ি উঠেছে আর প্রতি বাড়িতে লন্ঠন নয়, ইলেক্ট্রিসিটির আলোয় চারপাশ আলোকিত হয়ে রয়েছে। জানালায় বসে যুবক যুবতীরা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। আগে এই সময় গাঁয়ে মাঝরাত হয়ে যেতো, কিন্তু আজ... মানুষের কোলাহলে পরিপূর্ণ চারপাশ!
আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। বেশিক্ষণ বসে থাকা যায় না কোমরের যন্ত্রনায়! আহ্! কি আরাম বোধ হচ্ছে এই বিছানায় এতদিন পরে গা এলিয়ে দিয়ে! কখন দুচোখ ঘুমে ঢলে পড়লো....আমি জানি না!
- বাবু....!!!!!!!!!!
ঘুমটা ভেঙে গেল একটা ডাকে....! তখন মাঝরাত।
- কে ডাকলো আমাকে বাবু বলে? মা? মা এসেছে? আমার মা চারুলতা এসেছে?
সামনে তাকিয়ে দেখলাম..... হ্যাঁ ওইতো.... ঝড় উঠেছে, মুষলধারায় বৃষ্টি ঝরছে....আর.....আর আমার মা আমার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে......তার চুল উড়ছে, শাড়ির আঁচলটা উঠোনে লুটিয়ে পড়েছে...এই অন্ধকারেও আমি সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি....ওইতো মায়ের মায়াবী মুখখানা....ওইতো তার ডাগর দুই চোখ....!!!!
- মা গো....! আজ কতদিন তোমায় দেখিনি.....! ফিরে এসেছো মা তুমি.....? আমার কাছে ফিরে এলে কি? ও মা.....!!!!
একি! আমার ঘরের জানালার ফ্রেমটা সেই আগের অবস্থায় ফিরে গেছে! জানালার ওপারে দোতলা পাকা বাড়িগুলো কোথায় গেল? সেখানে তো সেই সময়ের নির্জন প্রান্তর আর ফাঁকা মাঠ! আমার এই দালান ঘরটা মাটির ঘরে রূপান্তরিত হয়ে গেছে! আমি কোথায় ফিরে গেলাম? আমার সেই ২০ বছর বয়সের গোবাদায়?
- বাবু আয়.....আজ যে যেতে হবে আমাদের!
মা হেসে উঠলো। আমি....আমি কেঁদে ফেললাম...!
- মা....আমি যে আর হাঁটতে পারি না গো.... হাঁটু মেলে দাঁড়াতে পারি না আর আগের মতো....আমায় এখন লাঠি হাতে চলতে হয় মা.... কোথায় চলেছো.... দৌড়াও না গো....আমি দৌড়ে তোমার নাগাল পাবো না মা....আমি যে আর চলতে পারি না মা ভালো করে....পা দুটো কাঁপে....!
মা দৌড়ে বারান্দার দাওয়া থেকে পাঁচিলের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালো হাসতে হাসতে।
- আয় বাবু.... আয়....!!!
আমি উঠলাম বিছানা থেকে....! আমার হাঁটুর ব্যাথা? আমার ব্যাথা নেই! কি হচ্ছে এসব? আমি লাঠি ছাড়াই দাঁড়াতে পারছি? আমার হাতের চামড়া আবার টান টান হয়ে গেছে...? চোখের চশমা ছাড়া স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমি! আমি আবার সেই যৌবনে ফিরে এসেছি!
বাইরে বেরিয়ে এলাম দৌড়ে।
- বাবা! তুমি কি করছো? কেমন আছো বাবা?
বাবা দাওয়ায় বসে বিড়ি টানছে। আমায় দেখে হেসে বললো,
- ব্যাটা, যা....চারু ডাকছে তোকে....আমায় আবার মাঠে যেতে হবে.....আমি ভালো আছি...তুই যা...!!
ওইতো রিনু আর মিনু মাটির গোয়ালঘরে দাঁড়িয়ে খড় চিবোচ্ছে! লতা ওখানে বসে আছে!
- লতা....তুই কি করছিস রে?
- দাদা....মা তোকে ডাকছে....যা দাদা....যা...!!
ইঁটের পাঁচিল, গোয়ালঘর, সব বদলে গিয়ে সেই আগের মতোই হয়ে গিয়েছে....মাটির!
- বাবু.... আয়...!
মা হাসলো আমায় দেখে।
- হ্যাঁ মা আসছি গো....আমি যে তোমার অপেক্ষাতেই আজ কত বছর বসে আছি....কতো খুঁজেছি তোমায় জানো...? যখন ছেলে-বউমা শহরে থাকে, কত তোমায় ডেকেছি একলা বসে....আসোনি কেন তুমি মা? আমায় কষ্ট দিতে বুঝি এতো ভালো লাগে তোমার?
- না বাবু....এইতো এসেছি....এইতো আমি.... কাঁদে না বাবু....আয় জলটা মুছিয়ে দিই!
মা আমার কাছে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে আমার চোখদুটো মুছিয়ে চুলে বিলি কেটে দিলো। তার গায়ের সেই গন্ধ আমি আবার পেলাম .... কতদিন পর....প্রাণভরে গ্রহণ করলাম সেই সুবাস! আজ কত বছর পর তোমায় পেলাম আমি!
- যাবি না? চল্ যাই ওই দীঘির পাড়ে!!!
- আগে বলো, আর কখনো ছেড়ে যাবে না আমায়? বলো তুমি!
আমি অঝোরে কেঁদে তাকে জড়িয়ে ধরলাম।
- না বাবু....তুই আমার শেষ ইচ্ছা পূরণ করলি....গোবাদাই এই বাড়িতে ফিরে এলি....আমি যে খুশি.... এখানেই তো তোকে আমি প্রথম ভালোবেসেছিলাম রে....আমরা আর কোনোদিন আলাদা হবো না...!
- মা আমি কি স্বপ্ন দেখছি গো?
- না বাবু.... এগুলো সত্যি....চিমটি কেটে দ্যাখ্!
চিমটি কেটে দেখলাম...! সত্যিই....এই সবকিছু সত্যি! মায়ের পেছনে পেছনে বেরিয়ে এলাম বাইরে। এ কি? সব পাকা বাড়িগুলো কোথায়? সব অদৃশ্য হয়ে গিয়ে সেই আমাদের আগের ছোট্ট গাঁ গোবাদায় পরিণত হয়ে গেল.... যেখানে পাশাপাশি মাটির বাড়িগুলো সার দিয়ে দাঁড়িয়ে, আর প্রত্যেক বাড়ির ভেতর থেকে লন্ঠনের আলো বেরিয়ে আসছে! রাস্তাঘাট পিচ থেকে মাটির হয়ে গেছে! বাইক, অটো, বাস, সব অদৃশ্য হয়ে গোরুর গাড়িগুলো একধারে জমা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওই তো মোড়ল জেঠু...!
- চয়ন, তুমি ফিরে এসেছো? কি যে খুশি আমি! যাও তোমার মা কে নিয়ে যাও....আজ যে তোমার মুক্তির দিন!
আমি পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম জেঠুকে।
- সুখী হও তোমরা!
ওইতো গ্রামের মেয়েরা কলসী কাঁখে পুকুর থেকে ফিরে আসছে! এই গভীর রাতে এরা সবাই কি করছে এখানে? তার ওপর ভয়ঙ্কর দুর্যোগ....ঝড় বৃষ্টির তান্ডব খেলায় এই প্রকৃতি উন্মত্ত হয়ে উঠেছে আজ। মা শাড়ির আঁচল হাওয়ায় ভাসিয়ে ছুটে চলেছে সেই বড় দীঘির কাছে! মাঝে মাঝে পেছন ফিরে আমায় ইশারা করে তার কাছে যেতে বলছে।
- ও মা.... দাঁড়াও....আমি আসছি...!
- বাবু....!
- মা গো...!
- আয়.....আয়.... বাবু.....আর আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না রে!
- আসছি মা....!
ছুটতে ছুটতে এসে দাঁড়ালাম দীঘির পাড়ে সেই বড় অশ্বত্থ গাছটার তলায় যেখানে আমি ও মা প্রথমবার মিলিত হয়েছিলাম! এতোটা পথ ছুটে আসায় আমি খুব হাঁপাচ্ছি দেখে মা হেসে ফেললো আর আমাকে জড়িয়ে ধরলো। মায়ের গায়ের ঘামের সুবাসে আমি ডুব দিলাম!
- তুই খুব হাঁপাচ্ছিস বাবু...! একটু বোস.... এখানটায়!
এই মুষলধারায় বৃষ্টির মধ্যেও আমাদের গায়ে জলের একটা ফোঁটাও লাগছে না! হঠাৎ এমনসময় বাজ পড়লো আর মা আমাকে ভয়ে জড়িয়ে ধরলো। মাকে বুকে চেপে ধরলাম আমি।
- মা...!
- চারু বলো আমায়!
- চারু...!
- হুমম!
- এটা স্বপ্ন নয়?
- না!
- আমি ওই বাড়িতে শুয়ে সত্যিই স্বপ্ন দেখছি না তো?
- না বাবু...!
- তবে?
- সব সত্যি.........সব সত্যি.................সব......সত্যি.......আজ থেকে আমরা একসঙ্গেই বাঁচবো রে!!!!!
আমি মায়ের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিলাম! তারপর তাকে আমার বুকে আরও চেপে ধরে তার মুখের তরল আমার মুখে শুষে নিয়ে পান করে গেলাম! ঝড় বইছে খুব, সঙ্গে মুষলধারায় বৃষ্টির মধ্যে বিদ্যুতের ঝলকানি....এরই মাঝে এই গভীর রাতে....এই দিঘীর পাড়ে....এই অশ্বত্থ গাছটার তলায় আমি আমার মায়ের সঙ্গে.....আমার স্ত্রীর সঙ্গে.....আমার চারুলতার সঙ্গে বসে আছি আবার.... চুম্বনে ভরিয়ে তুলছি তাকে। হঠাৎ এমনসময় আবার সামনাসামনি কোথাও বাজ পড়লো একটা....!
- বাবু.....!
বিদ্যুতের ভয়ে মা আমার বুকে মিশিয়ে দিল নিজেকে...! আহ্! শান্তি! তাকে জড়িয়ে ধরে হাসলাম.....বেরিয়ে এলো আমার মুখ থেকে...!
- বলো চারুলতা.....!!!!!
(সমাপ্ত)