অনুসূয়ার নতুন জীবন - অধ্যায় ১৩
বিয়ের পর মাসখানেক কেটে গেল।
মিতুর দিন শুরু হয় ভোরের আগে। সুরজের মা ডাক দিলেই উঠতে হয়। কুয়ো থেকে জল আনা, চুলা জ্বালানো, রান্নাবান্না, বাড়ি মুছতে হয়। সুরজ সকালে জমিতে যায়। ফিরে এলে তার হাত-পা ধোয়ানো, খাবার গরম করে দেওয়া—এসব এখন মিতুর রোজকার কাজ। শাশুড়ি বলেন, “পড়াশোনার কথা পরে ভাববি। আগে সংসার শিখ।”
মিতু প্রথমে চেষ্টা করেছিল। বিয়ের আগে সুরজ বলেছিল পড়াশোনা করা যাবে। একদিন সাহস করে বলল, “আমি কলেজের বইগুলো আনতে চাই। একটু পড়তে চাই।”
সুরজ সেদিন চুপ করে থেমে গেল। তারপর বলল, “এখন সময় নেই। সংসার সামলা। পরে দেখা যাবে।”
মিতু আর জোর করল না। বইগুলো অনুদের বাড়িতেই পড়ে আছে। কেউ আনেনি। দিন যেতে লাগল। রান্না, জল, কাপড় কাচা, সুরজের সেবা—এসবের ফাঁকে পড়ার সময় আর থাকে না। রাতে সুরজ এলে শরীর দিতে হয়। সকালে আবার উঠতে হয় তাড়াতাড়ি। চোখে ঘুম নিতে চায়। পড়ার ইচ্ছে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসছে।
শরীরে পরিবর্তন স্পষ্ট। রোদে কাজ করার কারণে গায়ের রং আরও কালো হয়েছে। হাত মোটা হয়েছে। চুল এলোমেলো। শাড়ি ছাড়া অন্য পোশাক নেই। সুরজ রোজ রাতে নেয়। মিতুর শরীর এখন আর তেমন বাধা দেয় না। যখন সুরজ স্তন চেপে ধরে, মিতুর নিঃশ্বাস ভারী হয়। যখন বাঁড়া ঢোকায়, কোমর নিজে থেকেই একটু নড়ে। গোঙানি বেরিয়ে আসে। মিতু লজ্জা পায়, কিন্তু থামাতে পারে না। এক রাতে সুরজ বলল, “তুমি এখন অনেক নরম হয়ে গেছো। আগে যেন অন্য মেয়ে ছিলে।”
মিতু চোখ বন্ধ করে সহ্য করল। মনে মনে জানে—সত্যিই বদলাচ্ছে। পড়াশোনার কথা মনে পড়লেও আর ততটা জ্বালা করে না। মনে হয়, সে জীবন অনেক দূরের হয়ে গেছে।
মানসিকতাতেও পরিবর্তন আসছে। প্রথমে রোজ রাতে কাঁদত। এখন আর কাঁদে না। শাশুড়ির কথা মেনে নেয়। সুরজ কিছু বললে মাথা নাড়ে। একদিন সুরজ বলল, “কাল থেকে তুমি আমার সাথে জমিতে যাবে। একটু হাঁটাহাঁটি করো।” মিতু আপত্তি করল না। গেল। রোদে মাথা ঘুরে গেল। তবু সহ্য করল।
অনুর দিকে তাকালে অন্য ছবি। অনুদের বাড়িতে পেট এখন ছয় মাসের। অনু আরও ভারী হয়েছে। হাঁটাচলা কষ্টকর। স্তন দুটো দুধে ভরে আছে। রামচন্দন এখনও রোজ নেয়, তবে একটু সাবধানে। অনু কোনো আপত্তি করে না। শাড়ি পরে, সিঁদুর গাঢ় করে, সংসার সামলায়। মিতুর কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। একদিন সরস্বতীকে জিজ্ঞেস করল, “মিতু কেমন আছে?”
সরস্বতী বললেন, “ভালো আছে। সংসার শিখছে। সুরজও খুশি।”
অনু চুপ করে রইল। তার আর যাওয়ার উপায় নেই। পেট নিয়ে এতদূর যাওয়া যায় না। আর রামচন্দনও বলবে না যেতে।
মিতুর বাড়িতে একদিন সুরজের মা বললেন, “পড়াশোনার আর দরকার নেই। তুমি এখন বউ। সংসারই তোমার কাজ। সুরজও চায় না তুমি বাইরে ঘুরে বেড়াও।”
মিতু সেদিন চুপ করে শুনল। ভেতরে একটা কিছু ভেঙে গেল। কলেজের স্বপ্নটা যেন পুরোপুরি দূরে সরে গেল। সে আর জিজ্ঞেস করল না। বইয়ের কথাও তুলল না।
রাতগুলো বদলে যাচ্ছে। সুরজ এখন মিতুকে আরও কাছে টানে। এক রাতে বলল, “তুমি আমার বউ। পড়াশোনা করে কী হবে? এখানে থেকে সংসার করো। বাচ্চা হবে। তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মিতু তার বুকে মুখ রেখে শুয়ে রইল। কিছু বলল না। শরীর সাড়া দিচ্ছে। মনও আস্তে আস্তে মেনে নিচ্ছে। প্রতিবাদ করার শক্তি কমে আসছে।
মাস দুয়েক পর মিতু নিজে থেকেই আর পড়াশোনার কথা তোলে না। সকালে উঠে রান্না করে, জল আনে, সুরজের সেবা করে, রাতে শরীর দেয়। চুল খোলা রাখে। শাড়ি পরে। সিঁদুর গাঢ় করে। আয়নায় নিজেকে দেখলে মনে হয়—এ মেয়েটা কে? কলেজের সেই মেয়েটা আর নেই।
অনুর পেট ক্রমেই বড়ো হচ্ছে। রামচন্দন তাকে নিয়ে সন্তুষ্ট। মিতুর খবর কদাচিৎ আসে। অনু শোনে আর চুপ করে থাকে। দুই মেয়ে দুই বাড়িতে। দুজনেরই জীবন একই ছাঁচে ঢুকে গেছে। একজন অনেক আগে, আরেকজন এখন। পড়াশোনার দরজা দুজনের জন্যই বন্ধ। সংসারের দরজা খোলা। আর সেই দরজা দিয়ে ঢুকে গেছে তারা দুজনেই।
মাস তিনেক কেটে গেল মিতুর বিয়ের পর।
উনিশ বছর বয়স। শরীর এখনো পুরোপুরি বড়ো হয়নি। বুক দুটো ভারী হয়েছে সুরজের রোজকার চোষায়, নিপল কালো ও সংবেদনশীল। পেট এখনো সমান, কিন্তু গত দুই মাস ধরে মাসিক বন্ধ। প্রথমে মিতু ভয় পেয়েছিল। শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করতে পারেনি। সুরজকেও বলেনি। রাতে বিছানায় শুয়ে পেটে হাত বুলিয়ে ভাবত—কী হচ্ছে আমার?
তারপর এক সকালে বমি হলো। চুলার ধোঁয়ায় মাথা ঘুরে গেল। শাশুড়ি দেখে ফেললেন। হাসলেন। “বাচ্চা হয়েছে বুঝি। সুরজের বংশ এগিয়ে যাবে।”
মিতুর পা কেঁপে গেল। উনিশ বছর বয়স। নিজেই এখনো মেয়ে। আর এখন পেটে আরেকটা জীবন। রান্নাঘরের মেঝেতে বসে পড়ল সে। চোখে জল এল। শাশুড়ি বললেন, “কাঁদিস না। এটাই সংসার। সুরজ খুশি হবে।”
সুরজ সন্ধ্যায় শুনে সত্যিই খুশি হলো। মিতুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “এবার তুমি সত্যিই আমার হয়ে গেলে। বাচ্চা হবে। আর পড়াশোনার কথা ভুলো।”
মিতু তার বুকে মুখ লুকোল। কিছু বলতে পারল না। ভয় পাচ্ছে। শরীর ছোট। পেট ফুলে গেলে কীভাবে কাজ করবে? কীভাবে সুরজকে সামলাবে রাতে? উনিশ বছর বয়সে মা হওয়া—এ কথা মনে হলেই গা কাঁপে।
দিন যেতে লাগল। বমি সকালে হয়। শরীর দুর্বল লাগে। তবু উঠতে হয় ভোরে। জল আনতে হয়। রান্না করতে হয়। শাশুড়ি বলেন, “গর্ভবতী বলে আরাম করবি না। হালকা কাজ করলে শরীর ভালো থাকবে।” মিতু করে। রোদে মাথা ঘোরে। কখনো কখনো উঠোনে বসে পড়ে। সুরজ দেখলে বলে, “সাবধানে থেকো। আমার বাচ্চা।”
রাতে সুরজ এখন আরও সাবধানে নেয়। কিন্তু ছাড়ে না। মিতুর পেটের ওপর হাত রেখে বলে, “এখানে আমার সন্তান। তুমি ওকে বড়ো করবে।” মিতু চোখ বন্ধ করে সহ্য করে। শরীর সাড়া দেয়। কিন্তু মনের ভেতর একটা বড়ো ভয়। উনিশ বছর বয়স। মা হওয়ার জন্য তৈরি নয় সে। তবু হতে হচ্ছে।
এদিকে অনুদের বাড়িতে অন্য খবর এল।
অনুর পেট তখন আট মাসের। হাঁটাচলা খুব কষ্টকর। স্তন দুটো দুধে ভরে ফুলে আছে। রামচন্দন তাকে নিয়ে ব্যস্ত। একদিন সকালে কিষাণগঞ্জ থেকে লোক এসে খবর দিল—অনুর বাবা খুব অসুস্থ। মৃত্যুশয্যায়। ডাক্তার বলেছেন আর বেশিদিন নেই। হার্টের সমস্যা। হঠাৎ করেই খারাপ হয়েছে।
অনু শুনে পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারল না। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। “বাবা…” গলা দিয়ে আর কথা বেরোল না।
রামচন্দন পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “এখন তোর যাওয়া যাবে না। পেট আট মাসের। রাস্তায় বিপদ হতে পারে। আমি খবর নিয়ে আসব।”
অনু তার হাত ধরল। “একবার দেখতে যাব। শেষবারের মতো।”
রামচন্দন মাথা নাড়ল। “না। ডাক্তারও বলবে না। তুই এখানে থাক। বাচ্চার কথা ভাব।”
সরস্বতীও বললেন, “বৌমা, এখন নড়াচড়া করো না। বাবার খবর আমরা নিয়ে আসছি।”
অনু বিছানায় শুয়ে কাঁদল। বাবার মুখ মনে পড়ছে। যে বাবা তাকে স্টেশনে এগিয়ে দিয়েছিল। যে বাবা বলেছিল সাবধানে থাকতে। এখন সেই বাবা মৃত্যুশয্যায়। আর মেয়ে গর্ভবতী অবস্থায় আটকে আছে অন্য গ্রামে। যেতে পারছে না।
মিতুর কাছেও খবর গেল পরের দিন। সুরজ বলেছিল। মিতু শুনে চুপ করে রইল। দিদির বাবা মরতে বসেছেন। দিদি যেতে পারছে না। আর নিজে—উনিশ বছর বয়সে পেটে বাচ্চা নিয়ে সংসার সামলাচ্ছে। দুই জনেরই জীবন যেন একই সুতোয় বাঁধা। কেউ কারও কাছে যেতে পারছে না।
মিতুর পেট তখনও বাইরে থেকে বোঝা যায় না। কিন্তু ভেতরে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। রাতে শুয়ে অনুভব করে। ভয় হয়। শাশুড়ি বলেন, “ছেলে হবে। সুরজের মতো।” মিতু চুপ থাকে। নিজে মা হওয়ার কল্পনা করতে পারে না। উনিশ বছর বয়স। খেলার বয়স। পড়ার বয়স। এখন পেটে বাচ্চা। রান্না। স্বামীর সেবা। শরীর ক্লান্ত। মন আরও ক্লান্ত।
এক রাতে সুরজ তার পেটে কান পেতে শুনল। “নড়ছে। আমার বাচ্চা।” মিতুর চোখ দিয়ে জল পড়ল। সুরজ মুছে দিল। “কাঁদিস না। তুমি মা হবে। ভালো মা।”
মিতু পাশ ফিরে শুয়ে রইল। মনে মনে বলল—আমি তৈরি নই। কিন্তু তৈরি হতেই হবে। উনিশ বছর বয়স। আর কোনো পথ নেই।
অনুর বাবার অবস্থা দিনকে দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। রামচন্দন একদিন গিয়ে দেখে এল। ফিরে এসে অনুকে বলল, “বাবা তোকে মনে করছে। কিন্তু তোর যাওয়া সম্ভব নয়। উনিও বুঝবেন।”
অনু মুখ চাদরে চেপে কাঁদল। পেটের বাচ্চা নড়াচড়া করছে। বাবার শেষ সময়।