ক্ষমতার কফিন - অধ্যায় ২

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73571-post-6203731.html#pid6203731

🕰️ Posted on Fri May 8 2026 by ✍️ Orbachin (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1803 words / 8 min read

৫ আগস্টের সেই বিভীষিকাময় রাতের পর কেটে গেছে আরও কয়েকদিন। কুমিল্লা শহরেরই এক বিশ্বস্ত অনুসারীর ‘সেফ হাউজ’-এ রুদ্ধশ্বাস সময় কাটছিল সূচনা ও তার পরিবারের। জায়গাটা কোনো বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নয়, পুরনো আমলের স্যাঁতস্যাঁতে একতলা বাড়ির পেছনের অংশ। জানালার সব কটি লক করা, ভারী পর্দা টানা। ঘরের ভেতরে দিনের বেলাতেও আলো জ্বালাতে হয়, কিন্তু ভয়ে সেটাও করা যাচ্ছে না। মোমবাতির ম্লান আলোয় একেকটি মুখ যেন একেকটি প্রেতাত্মার মতো দেখাচ্ছে। এই কয়দিনে সূচনার শরীরের জৌলুস অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। এসি ছাড়া গরমে তার ফর্সা ত্বক লালচে হয়ে র‍্যাশ উঠে গেছে। তার বিশাল শরীরটা এই ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করছে। ঘামে ভেজা জামাকাপড় পাল্টানোর সুযোগ নেই বললেই চলে। পানি ও শুকনো খাবার যা মিলছে, তা গলা দিয়ে নামতে চাইছে না। বিকেলে প্রশাসনের এক পদস্থ কর্মকর্তা—যিনি একসময় বাহার সাহেবের নাম শুনলেই স্যালুট ঠুকতেন—হোয়াটসঅ্যাপে এনক্রিপ্টেড কল দিলেন। সূচনার বাবা ফোনটা ধরলেন। ওপাশ থেকে আসা গলাটা খুব দ্রুত এবং ভীতিজাগানিয়া, “স্যার, আর বেশিক্ষণ আপনাদের সেইফ রাখতে পারব না। ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট খারাপ। লোকাল সোর্সে খবর লিক হয়ে গেছে যে আপনারা শহরের ভেতরেই কোথাও আছেন। ছাত্ররা আর পাবলিক তন্নতন্ন করে খুঁজছে। পুলিশ এখন ব্যারাকেই আছে, কেউ আপনাদের প্রোটেকশন দিতে বের হবে না। আপনারা প্লিজ আজ রাতের মধ্যেই বর্ডার সাইডে মুভ করেন। ধরা পড়লে গণপিটুনি নিশ্চিত। আমরা হেল্পলেস।” লাইনটা কেটে গেল। এই ছোট বার্তাটাই ছিল মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার মতো। এই চার দেয়ালের নিরাপত্তাও এখন আর নেই। রাত দশটা। দরজায় বিশেষ সংকেতে টোকা পড়ল। আজিজ মিয়া এসেছে। সাথে আরও দুজন অপরিচিত লোক। তাদের চেহারা রুক্ষ, চোখেমুখে ক্রুরতা। এদের দেখলেই বোঝা যায় এরা সীমান্তের অন্ধকারের বাসিন্দা। আজিজ মিয়ার পরনে লুঙ্গি আর মলিন শার্ট। সে ভেতরে ঢুকে নিচু গলায় বলল, “বড় সাব, আর দেরি করা যাইবো না। আজ রাইতেই মুভ করতে হইবো। প্ল্যান রেডি।” সূচনার বাবা বাহার সাহেব জানতে চাইলেন, “কী প্ল্যান? কীভাবে যাব?” আজিজ মিয়া মেঝের ওপর বসে পড়ল। “রাস্তা সোজা না। হাইওয়েতে আর্মি আর ছাত্রদের চেকপোস্ট। আমরা মেইন রোড ধইরা যামু না। গ্রামের ভেতর দিয়া, ভাঙা রাস্তা দিয়া বুড়িচংয়ের দিকে আগামু। ওখান থেইকা শশীদল বর্ডার। কিন্তু সমস্যা হইলো, আপনাদের তিনজনকে এক গাড়িতে নেওয়া রিস্ক। যদি ধরা পড়েন, সবশুদ্ধা ধরা খাইবেন। আলাদা গেলে অন্তত বাঁচার চান্স থাকে।” পরিকল্পনা শুনে সূচনার বুকটা ধক করে উঠল। আলাদা হতে হবে? এই বিপদের মুখে মা-বাবাকে ছেড়ে তাকে একা যেতে হবে? “আমি একা যাব?” সূচনার গলায় আতঙ্ক। “উপায় নাই মা,” আজিজ মিয়া বলল। “বড় সাব আর আম্মাজান এক গাড়িতে যাইবেন। আর তুমি যাইবা আরেকটায়। তোমার লগে আমার বিশ্বস্ত লোক থাকবো। আমিও থাকুম ওই বহরে। বর্ডারের কাছে গিয়া আমরা আবার এক হইমু। এই জার্নি একদিনের না। বর্ডার ক্রস করতে, ইন্ডিয়ার সেফ জোনে ঢুকতে সব মিলাইয়া দিন দশেক সময় লাগতে পারে। পাহাড়ি পথ, জঙ্গল, কাঁটাতার—সব পার হইতে হইবো।” খরচের প্রসঙ্গ এল। আজিজ মিয়া কোনো ভনিতা করল না। “বড় সাব, বর্ডারে গার্ড আর লোকাল দালালদের মুখ বন্ধ করতে অনেক টাকা লাগবো। তার ওপর গাড়ি ভাড়া, রাস্তায় লাইনম্যান খরচ। সব মিলাইয়া দশ লাখ টাকা এখন ক্যাশ দিতে হইবো। বাকিটা ওপারে গিয়া।” টাকা এখন তাদের কাছে কাগজের টুকরোর মতো। বাহার সাহেব ইশারা করতেই সূচনার মা কোমরে লুকিয়ে রাখা কাপড়ের পটলি থেকে টাকার বান্ডিল বের করে দিলেন। দশ লাখ টাকা। আজিজ মিয়া টাকাটা গুনে নিল না, শুধু হাতে ওজন বুঝে পকেটে ঢুকিয়ে নিল। রাত বারোটা। শহরের অলিগলি তখন সুনসান, কিন্তু আতঙ্কের রেশ বাতাসে ভাসছে। বাড়ির পেছনের গেটে দুটো গাড়ি এসে দাঁড়াল। না, কোনো পাজেরো বা ল্যান্ড ক্রুজার নয়। দুটোই মাঝারি আকারের কাভার্ড ভ্যান বা ছোট ট্রাক—সাধারণত সবজি বা কনস্ট্রাকশনের মালামাল পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। আজিজ মিয়া তাড়া দিল, “জলদি করেন। বেশিক্ষণ গাড়ি খাড়াইয়া থাকলে সন্দেহ হইবো।” বিদায়ের মুহূর্তটা ছিল হৃদয়বিদারক। সূচনার মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্না চেপে রাখলেন। বাবা শুধু মাথায় হাত রাখলেন। তাদের চোখেমুখে এক অজানা শঙ্কা—এই দেখাই কি শেষ দেখা? সূচনার বাবা-মাকে প্রথম ট্রাকে তুলে দেওয়া হলো। ভেতরে বস্তার আড়ালে তাদের বসানো হলো। এবার সূচনার পালা। দ্বিতীয় ট্রাকটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে। সূচনার পরনে এখন সাধারণ সুতি কামিজ, তার ওপর একটা কালো *। কিন্তু তার স্থূল শরীরের কারণে *টা বেশ আঁটসাঁট হয়ে আছে। ট্রাকের পেছনের ডালা খোলা। মাটি থেকে বেশ উঁচুতে। আজিজ মিয়া ইশারা করল, “মা, উঠেন।” সূচনা ট্রাকের দিকে তাকালেন। জীবনে কখনো তিনি গাড়ির পাদানিতে পা রেখে ওঠেননি, সবসময় ড্রাইভার দরজা খুলে দিয়েছে। আজ তাকে এই উঁচু ট্রাকে চড়তে হবে। তিনি পা বাড়ানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার ভারী শরীরটা ওপরে তুলতে পারলেন না। হাঁটুর ব্যথায় ককিয়ে উঠলেন। “পারছি না... অনেক উঁচু,” সূচনার গলায় কান্না। আজিজ মিয়া বিরক্ত হলো। সময় কম। সে তার সঙ্গীদের ইশারা করল। “ধরো ওনারে। টাইনা তোলো।” দুজন ষণ্ডা-মার্কা লোক এগিয়ে এল। একজন সূচনার পা ধরে ওপরে ঠেলতে লাগল, আরেকজন ওপর থেকে হাত ধরে টানতে লাগল। সূচনার মনে হলো তিনি এক বস্তা চালের মতো। এই স্পর্শগুলো অপমানজনক, কিন্তু এখন সম্মানের চেয়ে জীবন বড়। লোকগুলোর গায়ের ঘামের গন্ধে সূচনার বমি আসার উপক্রম হলো। কোনোমতে হেঁচড়ে-পেঁচড়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে তাকে ট্রাকের পাটাতনে তোলা হলো। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। রড আর সিমেন্টের বস্তার মাঝখানে অল্প একটু জায়গা। সেখানেই তাকে বসতে হবে। এসি নেই, ফ্যান নেই। আছে শুধু ভ্যাপসা গরম আর ডিজেলের কটু গন্ধ। সূচনা কোনোমতে বস্তার ওপর হেলান দিয়ে বসলেন। তার শরীরটা ঘামে ভিজে জবজবে। *র ভেতরে দম বন্ধ হয়ে আসছে। আজিজ মিয়া তার সাথে এই ট্রাকেই উঠল। সাথে আরও দু-তিনজন অচেনা পুরুষ। তাদের সবার হাতে লাঠি আর কোমরে গোঁজা ধারালো কিছু। এরা তার রক্ষক, নাকি ভক্ষক—সূচনা জানেন না। এক গাড়িতে এই অচেনা পুরুষদের সাথে তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। “ডালা লাগাইয়া দে,” আজিজ মিয়া নির্দেশ দিল। শব্দ করে ট্রাকের পেছনের ভারী লোহার দরজা বন্ধ হয়ে গেল। শেষ আলোটুকুও নিভে গেল। এখন শুধু অন্ধকার। সূচনার মনে হলো তিনি কোনো জ্যান্ত কবরে ঢুকেছেন। ইঞ্জিন চালু হলো। ট্রাকটা থরথর করে কেঁপে উঠল। সেই কম্পন সূচনার হাড়ের ভেতর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল। গাড়িটা নড়ে উঠল, তারপর ধীরে ধীরে গতি বাড়াল। অন্ধকারের মধ্যে বসে সূচনা অনুভব করলেন, তার পরিচিত পৃথিবীটা পেছনে পড়ে রইল। সামনে অনিশ্চিত দশ দিনের দুর্গম পথ। তিনি চোখ বন্ধ করলেন, চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জলটা অন্ধকারেই শুকিয়ে গেল। ট্রাকের চাকাগুলো পিচঢালা পথ মাড়িয়ে এগিয়ে চলছে সীমান্তের নিষিদ্ধ রেখার দিকে। রাত তখন আনুমানিক তিনটা। বুড়িচং উপজেলার ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন এক নির্জন কাঁচা রাস্তা। চারদিকে ঘন জঙ্গল আর ধানের ক্ষেত। অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে ট্রাকের হেডলাইটের আলো যেন খুব বেশি দূর এগোতে পারছে না। ট্রাকের চাকাগুলো কর্দমাক্ত রাস্তায় বারবার ডেবে যাচ্ছে, ইঞ্জিন গোঙাচ্ছে আহত পশুর মতো। ভেতরে, সেই লোহার খাঁচার মতো অন্ধকার খোলে বসে থাকা তাহসীন নাহার সূচনার মনে হচ্ছিল সময় থমকে গেছে। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে তিনি একনাগাড়ে ঝাঁকুনি সহ্য করছেন। তার ভারী শরীরটা প্রতিটি ঝাঁকুনিতে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছে। গরমে, ঘামে আর ডিজেলের গন্ধে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আজিজ মিয়া মাঝে মাঝেই ড্রাইভারের সাথে সাংকেতিক টোকা দিয়ে যোগাযোগ করছে। সবকিছু ঠিকই ছিল, কিন্তু নিয়তি আজ অন্য পাশা খেলতে প্রস্তুত। হঠাৎ ট্রাকটা সজোরে ব্রেক কষল। সূচনার বিশাল শরীরটা গিয়ে আছড়ে পড়ল সামনের সিমেন্টের বস্তার ওপর। তিনি যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলেন। বাইরে থেকে ভেসে এল কর্কশ চিৎকার, “গাড়ি থামা! হেডলাইট অফ কর! হাত উঁচা করে নিচে নাম!” বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল সূচনার। এটা আজিজ মিয়ার লোক নয়। এই গলা, এই কমান্ডিং টোন—এরা ইউনিফর্ম পরা লোক। বাইরে বুটের ভারী শব্দ। সার্চলাইটের তীব্র আলো ট্রাকের ক্যানভাস ভেদ করে ভেতরে ঢুকছে। “ভেতরে কে আছিস? বাইরে আয় সব!” আজিজ মিয়া ফিসফিস করে বলল, “মা, চুপ করে থাকেন। একদম নড়বেন না। আমি কথা কইতাছি।” আজিজ মিয়া ট্রাকের ডালা খুলে নিচে নামল। সূচনা শুনতে পেলেন আজিজ মিয়া তার স্বভাবসুলভ চাটুকারিতার সুরে বলছে, “স্যার, আমি আজিজ। সবজির গাড়ি। কাঁচামাল নষ্ট হইয়া যাইবো...” কিন্তু আজকের রাতটা আজিজ মিয়ার চেনা সমীকরণের বাইরে। “চুপ থাক বেয়াদব! সবজি না সোনা পাচার করছিস, সেটা আমরা জানি। সার্চ কর গাড়ি!” কয়েকজন জওয়ান ট্রাকের পেছনে উঠে এল। তাদের হাতে শক্তিশালী টর্চলাইট আর রাইফেল। তারা বস্তাগুলো সরাতে শুরু করল। সূচনা নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু এই বিশাল শরীর নিয়ে লুকানো অসম্ভব। টর্চের আলো সোজা গিয়ে পড়ল তার কালো * পরা অবয়বের ওপর। “স্যার! এখানে একজন মহিলা আছে! সন্দেহজনক!” একজন জওয়ান চিৎকার করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেল। আজিজ মিয়া এবং তার সঙ্গীদের বন্দুকের নলে ঘিরে ফেলা হলো। ট্রাকের চারপাশে তখন অন্তত ২০-২৫ জন বিজিবি সদস্য। তাদের চোখেমুখে শিকার ধরার উত্তেজনা। “নেমে আয়! জলদি!” সূচনা নড়তে পারছিলেন না। ভয়ে তার হাত-পা অবশ হয়ে গেছে। জওয়ানরা কোনো ভদ্রতার ধার ধারল না। দুজন উঠে এসে সূচনাকে ধরে হেঁচকা টান দিল। তার ভারী শরীরটা ট্রাকের পাটাতন থেকে প্রায় গড়িয়ে নিচে পড়ল। কাদার মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন সূচনা। তার * কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল। সার্চলাইটের আলোয় সূচনার মুখটা দেখার চেষ্টা করল একজন। “আরে! এ তো মনে হয় বড় শিকার! মুখ খোল!” * সরাতেই জওয়ানদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। “স্যার! এ তো কুমিল্লার মেয়র! বাহারের মেয়ে সূচনা!” খবরটা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ল। ওয়ারলেসে মেসেজ চলে গেল। প্লাটুন কমান্ডারের নির্দেশে আজিজ মিয়া আর তার লোকদের হাত বেঁধে একপাশে বসিয়ে রাখা হলো। আর সূচনাকে নিয়ে যাওয়া হলো রাস্তার পাশে তড়িঘড়ি করে বানানো একটি অস্থায়ী ক্যাম্প বা টিনের চালার নিচে, যা প্লাটুন হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। টিনের চালায় টিমটিম করে একটা এমার্জেন্সি লাইট জ্বলছে। ভেতরে একটা নড়বড়ে কাঠের টেবিল আর দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার। সূচনাকে সেখানে নিয়ে আসা হলো। তার সারা গায়ে কাদা, চোখেমুখে আতঙ্ক, শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে ঝড়ের মতো। কিছুক্ষণ পর সেখানেু ঢুকলেন প্লাটুন কমান্ডার। নাম ক্যাপ্টেন রাশেদ । বয়স পঁয়ত্রিশের কোঠায়। সুঠাম দেহ, চোখেমুখে এক ধরণের তীব্র ঘৃণা আর আক্রোশ। ৫ আগস্টের পর থেকে প্রশাসনের অনেকের মধ্যেই পুরনো সরকারের প্রতি ক্ষোভ দানা বেঁধেছে, আর আজ তার সামনে সেই সরকারের এক প্রভাবশালী প্রতীক। ক্যাপ্টেন রাশেদ চেয়ারে বসলেন না। তিনি টেবিলের ওপর হিপ পকেটের পিস্তলটা রাখলেন। তারপর সূচনার দিকে তাকিয়ে একটা বিদ্রূপাত্মক হাসি দিলেন। “কী ম্যাডাম মেয়র? ওয়েলকাম টু রিয়েলিটি। মুনশীবাড়ির এসি রুম ছেড়ে এই মশা আর কাদার রাজ্যে কেমন লাগছে?” সূচনা কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তিনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার পা কাঁপছে। তিনি বসতে চাইলেন, কিন্তু বসার অনুমতি নেই। ক্যাপ্টেন রাশেদ উঠে সূচনার চারপাশে ঘুরতে শুরু করলেন। হাতে একটা লাঠি, সেটা দিয়ে তিনি সূচনার *র ধুলো ঝাড়ার ভান করে খোঁচা দিলেন। “তাকান আমার দিকে!” রাশেদ ধমক দিলেন। সূচনা ভয়ে ভয়ে তাকালেন। “এই সেই তাহসীন নাহার সূচনা! কুমিল্লার সম্রাজ্ঞী। যার বাবা বাহার সাহেব আঙুল উঁচিয়ে কথা বললে পুরো শহর কাঁপত। আর আপনি? আপনি তো ছিলেন রাজকন্যা। বাপ-মেয়ের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। টেন্ডারবাজি, দখল, চাঁদাবাজি—কোন্টা বাদ রেখেছেন? আর আজ? আজ চোরের মতো * পরে সবজির গাড়িতে করে পালাচ্ছেন?” রাশেদের প্রতিটি শব্দ চাবুকের মতো সূচনার গায়ে বিঁধছিল। “স্যার... আমি কিছু জানি না... আমাকে যেতে দিন...” সূচনা কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে বললেন। “যেতে দেব?” রাশেদ অট্টহাসি দিলেন। “এত সহজ? আপনারা কি মানুষকে যেতে দিয়েছিলেন? গত পনেরো বছর ধরে সাধারণ মানুষের ওপর যে স্টিম রোলার চালিয়েছেন, তার হিসাব কে দেবে? আমার নিজের ছোট ভাই আপনাদের ছাত্রলীগে জয়েন করেনি বলে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। মনে আছে?” রাশেদ এবার সূচনার শারীরিক গঠনের দিকে ইঙ্গিত করলেন। তার দৃষ্টিতে এখন নোংরা কৌতুক। “মাশাআল্লাহ! শরীরটা তো বেশ বানিয়েছেন। জনগণের টাকা তো কম মারেননি। লুটেপুটে খেয়ে শরীরটাকে তো একটা মাংসের পাহাড় বানিয়েছেন। মুনশীবাড়ির বিরিয়ানি আর কাবাব খেয়ে খেয়ে তো নড়তেই পারেন না। ট্রাক থেকে নামাতেও তো ক্রেন লাগার দশা! এই চর্বির প্রতিটা কেজিতে গরিবের রক্ত লেগে আছে, ম্যাডাম।” সূচনার অপমানে মরে যেতে ইচ্ছে হলো। তার স্থূলতা নিয়ে তিনি আজীবন হীনম্মন্যতায় ভুগেছেন, কিন্তু ক্ষমতার দাপটে কেউ কখনো মুখের ওপর কিছু বলার সাহস পায়নি। আজ এই জুনিয়র অফিসার তাকে তার শরীর নিয়ে এমন জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করছে, আর তিনি কিছুই করতে পারছেন না। “আমার বাবা... আমার বাবা কোথায়?” সূচনা প্রসঙ্গ ঘোরানোর চেষ্টা করলেন। “বাপের চিন্তা বাদ দেন। বুড়ো শিয়ালটাও ধরা পড়বে। আগে নিজের চিন্তা করেন। আপনার কাছে তো অনেক মালকড়ি থাকার কথা। আজিজ মিয়ার মতো চোরাকারবারির সাথে ডিল করেছেন যখন, নিশ্চয়ই পকেটে ওজনে ভারী কিছু আছে।”