The Barter System - অধ্যায় ৩১
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ: এক চূড়ান্ত লেনদেন
১৫.১. নিশীথ-স্বপ্ন এবং এক অলিখিত অর্ঘ্য:
মানুষের অবচেতন মন হলো এক বিস্তীর্ণ, বন্য এবং লাগামহীন নাট্যমঞ্চ। সেখানে সেন্সরশিপের কোনো কাঁচি চলে না, সামাজিক শালীনতার কোনো বেড়াজাল নেই। এই অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে মানুষের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত মঞ্চস্থ করে চলে তার সবচেয়ে সযত্নে লুকিয়ে রাখা নাটকগুলো—যেখানে জমা থাকে খরচ না-হওয়া সুখের কাঁচা টুকরো, গহীনের কান্না, এবড়োখেবড়ো হতাশা আর এক নিস্তব্ধ, নাছোড়বান্দা আকাঙ্ক্ষা। বিজ্ঞান হয়তো খুব শুষ্ক গলায় বলে যে স্বপ্ন হলো নেহাতই দিনের বেলায় কুড়িয়ে পাওয়া স্মৃতির জঞ্জাল সাজানোর একটা নৈশ প্রক্রিয়া, যেখানে মস্তিষ্ক মানুষের জাগতিক উদ্বেগ আর উচ্চাশাগুলোকে নিয়ে কিছু আজগুবি গল্পের বুনন তৈরি করে। কিন্তু কিছু স্বপ্ন বিজ্ঞানের সেই শুষ্ক সংজ্ঞাকে ছাপিয়ে যায়।
৪ঠা সেপ্টেম্বর, শুক্রবার রাতের সেই নিস্তব্ধ প্রহরে, ডক্টর ইন্দিরা সেন যখন তাঁর বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছিলেন, তখন তাঁর দেখা সেই স্বপ্নটা কোনো সাধারণ স্বপ্ন ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর নিজের সত্তার এক নির্দয়, আবরণহীন আয়না—যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের ভেতরের এক ভয়ংকর সত্যকে আবিষ্কার করেছিলেন। তবে সেদিন রাতের অন্ধকারে নিজের অবচেতন মনের অসংবৃত রূপের সাক্ষী থাকা মানুষটি কেবল তিনি একা ছিলেন না। ঠিক কয়েকটা দেওয়ালের ওপারে, বাইশ ডিগ্রিতে নামিয়ে রাখা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের ভারী চাদরের তলায়, অন্য আরেকটি অবচেতন মনও প্রবলভাবে ছটফট করছিল। রাহুলও স্বপ্ন দেখছিল। এক প্রগাঢ়, অমেয় প্রেমের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের জ্বরে ওর পুরো শরীর তখন ঘামে ভিজে জবজবে।
রাহুলের সেই স্বপ্নটা রোজকার চেনা, সাদামাটা বাস্তবের মতো ছিল না। সেটা ছিল এক রাজকীয়, অপার্থিব জগতের দৃশ্য। একটা বিশাল, গম্বুজওয়ালা ঘর। ঘরের মেঝে আর দেওয়ালগুলো শ্বেতপাথরের। মাঝরাতের সময়, জানলার ফিনফিনে সাদা, রেশমি পর্দা ফুঁড়ে চুইয়ে পড়ছে জ্যোৎস্নার এক মায়াবী, স্নিগ্ধ আলো। সেই আলোর জাদুতে ঘরের প্রতিটা কোণ, প্রতিটা আসবাবের তীক্ষ্ণ ধারগুলো যেন এক অসীম কোমলতায় গলে গেছে। চারপাশের বাতাসে ভাসছে অচেনা, বুনো ফুলের এক মদির সুবাস। রাহুল যেন এক ঘোরলাগা পায়ে হেঁটে চলেছে সেই ঘরের ভেতর। হঠাৎ ওর নজর গিয়ে পড়ল ঘরের ঠিক মাঝখানে। সেখানে একটা স্নানপাত্র... একটা বাথটাব। কিন্তু এটা আধুনিককালের কোনো সাধারণ টাব নয়। সেটা একটা বিশাল, ডিম্বাকৃতি মসৃণ মার্বেলের তৈরি আধার, যার কিনারাগুলোতে প্রাচীন আমলের নিখুঁত, রাজকীয় নকশা খোদাই করা—সোনালি আর ঘিয়ে রঙের এক অপূর্ব মিশেল। পাথরটাকে দেখতে প্রাচীন অথচ চূড়ান্ত বিলাসবহুল মনে হচ্ছে, যা বাইরে থেকে স্পর্শ করলে হয়তো হিমশীতল লাগবে, কিন্তু তার ভেতরে ধারণ করে আছে স্নানের এক আদিম, জ্বলন্ত উত্তাপ। ওই গভীর আধারের চারপাশটা এমনভাবে সাজানো, যেন ওটা কোনো রানির নিজস্ব, একান্ত গোপন এক অভয়ারণ্য। টাবের ভেতর থেকে অতি সূক্ষ্ম, প্রায় স্বচ্ছ বাষ্পের কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠছে, ঠিক যেন নিস্তব্ধ বাতাসে কারোর উষ্ণ, নিশ্চুপ নিশ্বাস। চারপাশের পরিবেশটা এক অলস, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং চরম নিভৃত আহ্বানে মোড়া—উষ্ণ, শব্দহীন এবং এতটাই ব্যক্তিগত যে মনে হচ্ছিল ওই ঘরের ভেতরে সময় তার নিজস্ব গতি হারিয়ে ফেলেছে।
কোনো এক ব্যাখ্যাহীন, জাদুকরী আকর্ষণে রাহুল ওই টাবটার দিকে এগিয়ে গেল। ওর খালি পা মেঝের ওপর কোনো শব্দই তৈরি করছিল না। এক পা, দু'পা... ঘরের ওই নিস্তব্ধতা যেন ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে আরও কাছে টেনে নিচ্ছিল। টাবটার কাছাকাছি আসতেই ভেতরের জলটা ওর দৃষ্টিতে স্পষ্ট হলো। জলটা বেশ উষ্ণ এবং সামান্য ঘোলাটে, তার ওপরের স্তরটা অবিরত, সূক্ষ্ম বাষ্পের চাদরে ঢাকা। জলের সেই উত্তাপ যেন টাবের চারপাশের বাতাসটাকেও নরম করে দিয়েছে। জলের উপরিভাগে খুব সামান্য নড়াচড়া, তরল রুপোর মতো আলো পিছলে যাচ্ছে সেখানে। আর ঠিক তখনই রাহুল খেয়াল করল—জলের ওই বিশাল বিস্তৃতি জুড়ে ঘন হয়ে ভেসে আছে অগণিত গাঢ় লাল আর ম্যাজেন্টা রঙের গোলাপের পাপড়ি। পুরো উপরিভাগ জুড়ে তারা যেন একটা ভাসমান গালিচা তৈরি করেছে। পাপড়িগুলোর ধারগুলো জলে ভিজে আরও গাঢ় হয়ে গেছে। কিছু পাপড়ি অলসভাবে এদিক-ওদিক ভাসছে, আর কিছু পাপড়ি একসাথে জড়ো হয়ে ছোট ছোট রঙিন দ্বীপের মতো তৈরি করেছে, যা জলের ভেতরের সবকিছুকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে আড়াল করে রেখেছে।
টাবের আরও একটু কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর পর রাহুলের ঘোর-লাগা চোখদুটো হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। জলের ওই পাপড়ির আস্তরণের নিচে কেউ একজন শুয়ে আছে! একজন নারী। প্রথমটায় তাঁকে প্রায় বোঝাই যাচ্ছিল না, উষ্ণ জল আর ওই ভাসমান গোলাপের পাপড়ির আবরণে তাঁর শরীরটা সম্পূর্ণভাবে ঢাকা। কেবল তাঁর দীর্ঘ, রেশমের মতো কালো চুলগুলো জলের ওপর ছড়িয়ে আছে, ঠিক যেন কালো কালির স্রোত। ভিজে, চকচকে সেই চুলের গোছাগুলো পাপড়ির মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে। ভাসমান ওই ফুলের নিচে তাঁর শরীরের অবয়বটা একটা ফ্যাকাসে, তরল ছায়ার মতো মনে হচ্ছিল—তাঁর বুকের ওই নরম ওঠানামা জলের সাথে মিশে এক শান্ত ছন্দে স্পন্দিত হচ্ছে, কোমরের ওই সরু খাঁজ, নিতম্বের ওই সুডৌল বিস্তার, আর লম্বা, মসৃণ উরুদুটো ক্রমশ গভীর জলের নিচে হারিয়ে গেছে। জলের পৃষ্ঠ আর ভাসমান পাপড়িগুলো তাঁর শরীরের প্রতিটা বাঁক আর ভাঁজকে এক অসীম মায়ায় ঢেকে রাখলেও, জলের নিচে থাকা ওই শরীরটার যে এক জ্বলন্ত, জীবন্ত উত্তাপ আছে, তা বিন্দুমাত্র ভুল করার উপায় নেই। রাহুল যেন সম্মোহিত হয়ে আরও এক পা কাছে এগিয়ে গেল। বাষ্পের উষ্ণতা ওর গালে এসে লাগল। গরম জল আর পিষ্ট হওয়া গোলাপের ওই তীব্র সুবাস ওর ফুসফুসকে কানায় কানায় ভরিয়ে দিল।
অবশেষে ও সোজা টাবটার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল, দৃষ্টিটা নিচের দিকে নিবদ্ধ। আর ঠিক তখনই, খুব ধীরে ধীরে—যেন তিনি রাহুলের উপস্থিতিটা টের পেয়েছেন—জলের নিচে থাকা ওই নারীমূর্তি ওপরের দিকে উঠতে শুরু করলেন। তাঁর শরীরের ওঠানামায় জলটা এক মোলায়েম, তরল শব্দ করে দু'পাশে সরে যেতে লাগল। প্রথমে জলের বুক চিরে বেরিয়ে এল তাঁর মাথার ওই কালো চুলের মুকুট, তারপর তাঁর ফর্সা কপাল, বন্ধ চোখের পল্লব, এবং নাকের তীক্ষ্ণ বাঁক। বাষ্পগুলো তাঁর ত্বকের সাথে সেঁটে রইল যখন তিনি আরও একটু ওপরের দিকে উঠলেন। তাঁর ওই অনাবৃত, ফর্সা শরীর থেকে জলটা লম্বা, চকচকে ধারায় গড়িয়ে পড়তে লাগল। ভিজে কালো চুলগুলো পাপড়ির ওপর ছড়িয়ে গেল। তারপর জলের ওপর ভেসে উঠল তাঁর দুই কাঁধ, বুকের সেই পূর্ণ, নরম এবং সুডৌল স্ফীতি, কলারবোনের পেলব রেখা, আর তলপেটের সেই মসৃণ প্রান্তর। গোলাপের পাপড়িগুলো জলের স্রোতের সাথে সাথে পিছলে গিয়ে তাঁর ত্বকের সাথে সেঁটে রইল—কয়েকটা পাপড়ি আটকে রইল তাঁর স্তনের নরম ঢালে, কয়েকটা পাপড়ি ভাসতে লাগল তাঁর নাভির ঠিক নিচে। শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি খুব ধীরে ধীরে, এক অমোঘ ছন্দে উন্মোচিত হতে লাগল; জল যেন পরম মমতায় তাঁর শরীরের প্রতিটা উপত্যকা আর স্ফীতিকে ছুঁয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। উষ্ণতার কারণে তাঁর ফর্সা ত্বকটা এক লাজুক রক্তিমাভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
আর তারপর রাহুল তাঁর মুখটা পরিষ্কার দেখতে পেল।
তিনি আর কেউ নন। তিনি ইন্দিরা। ওর মা।
এই চেনা মুখটার শনাক্তকরণ রাহুলের মগজে একটা ধীর, অথচ প্রলয়ঙ্করী স্রোতের মতো আছড়ে পড়ল। ওই পরিচিত, চিরচেনা মুখাবয়ব—ওই নরম ঠোঁট, ওই কাজল-কালো চোখ যা এখন পুরোপুরি খোলা, নাকের ওই নিখুঁত গড়ন আর ভুরুর ওই সূক্ষ্ম বাঁক—এসবই তো সেই নারীটির, যাঁর কোল আলো করে ও বড় হয়েছে। অথচ, আজ তিনি এখানে এই মার্বেলের টাবে সম্পূর্ণ নগ্ন, ভিজে অবস্থায়, গোলাপের পাপড়ির মাঝে শুয়ে আছেন, তাঁর পুরো শরীরটা ওপর থেকে তাকিয়ে থাকা রাহুলের চোখের সামনে আক্ষরিক অর্থেই এক খোলা খাতার মতো উন্মুক্ত। বাষ্পের কুণ্ডলী তাঁকে ঘিরে উঠছে। পাপড়িগুলো তাঁর ত্বকের উত্তাপ মেখে পড়ে আছে। জলের ফোঁটাগুলো তাঁর ঠোঁট ছুঁয়ে গলার ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তাঁর ওই গভীর চোখদুটো সোজা এসে মিলল রাহুলের চোখের সাথে। সেই দৃষ্টিতে কোনো চমক নেই, কোনো আড়ষ্টতা নেই। দৃষ্টিটা বড্ড ধীর, চোখের পাতা সামান্য ভারী, আর তাতে মিশে আছে এক অমেয়, অবর্ণনীয় নিবিড়তা। সেখানে কোনো লুকোছাপা নেই, আছে কেবল এক প্রজ্ঞাময়ী, নীরব উত্তাপ। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা খুব হালকা, পেলব হাসি ফুটে উঠল—বড্ড নরম, বড্ড আদুরে—যেন তিনি ঠিক এই মুহূর্তটার জন্যই অনন্তকাল ধরে অপেক্ষা করছিলেন। বাষ্পের কারণে তাঁর মুখের রেখাগুলো সামান্য ঝাপসা লাগলেও, তাঁর ওই চোখের দৃষ্টির প্রখরতা রাহুলের মেরুদণ্ড দিয়ে আগুন বইয়ে দিচ্ছিল। তিনি কোনো রকম লজ্জা বা সংকোচ ছাড়াই, অত্যন্ত শান্তভাবে রাহুলকে সুযোগ দিচ্ছিলেন তাঁর ভাসমান শরীরের প্রতিটা নিখুঁত বাঁক আর ভাঁজকে চোখ ভরে দেখার।
তারপর তিনি জলের ভেতর থেকে নিজের ডান হাতটা খুব ধীরে ধীরে ওপরে তুললেন; অত্যন্ত সুচিন্তিত, আহ্বানকারী একটা ভঙ্গিতে হাতটা রাহুলের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। তাঁর আঙুলের ডগা থেকে স্বচ্ছ জলের ফোঁটাগুলো একটা ধীর, ছান্দিক শব্দ তুলে টাবের জলের ওপর ঝরে পড়তে লাগল। তাঁর এই নড়াচড়াটা ছিল বড্ড অলস, নেশাতুর, এবং এক না-বলা, অলিখিত সমর্পণের ডাক। তাঁর চোখদুটো এক সেকেন্ডের জন্যও রাহুলের চোখ থেকে সরল না। জলটা তখনও তাঁকে পরম মমতায় জড়িয়ে আছে, গোলাপের পাপড়িগুলো তাঁর ত্বকের সাথে সেঁটে আছে, আর তাঁর ওই বাড়িয়ে দেওয়া খোলা হাতটা শুধু অপেক্ষা করছে—টাবের ওই উষ্ণতা, পিষ্ট হওয়া গোলাপের ওই সুবাস, আর তাঁর নিজের শরীরের ওই স্বর্গীয় ওমে রাহুলকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।
"আয় সোনা, মায়ের কাছে আয়..."
https://iili.io/n9Oenl1.png
ভোরের নিস্তব্ধতা চিরে রাহুলের ঘুমটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। ওর পুরো শরীরটা একটা জেনারেটরের মতো থরথর করে কাঁপছে, আর কপাল থেকে ঘাম চুইয়ে পড়ছে। ঘড়িতে তখন ভোর চারটে। ও একটা বড় করে খাবি-খাওয়া নিশ্বাস নিয়ে নিজের গায়ের ওপর থেকে চাদরটা এক টানে সরিয়ে দিল। নিচের দিকে তাকাতেই ওর মগজটা যেন অসাড় হয়ে গেল। ওর পরনের ট্র্যাকসুটটা পুরোপুরি ভিজে, নষ্ট হয়ে গেছে, আর ও নিজের উরুর ওপর দিয়ে একটা উষ্ণ, আঠালো স্রোত নেমে যাওয়ার স্পষ্ট অনুভূতি টের পাচ্ছে। কী ঘটে গেল এইমাত্র, সেটা বুঝতে ওর কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। ও ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। বুকের ধুকপুকানিটা শান্ত হতে বেশ কয়েক মিনিট সময় লাগল। ওর এই উনিশ বছরের জীবনে ঘুমের ঘোরে এরকম শারীরিক স্খলনের অভিজ্ঞতা নেহাতই হাতে গোনা কয়েকবার হয়েছে; কিন্তু সেই সব কটা ক্ষেত্রেই ও সকালে উঠে ভুলেই যেত যে ও ঠিক কী স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু রাহুল খুব ভালো করেই জানে, আজকের এই ভোরের স্বপ্নটা ও ওর জীবনকাল থাকতে কোনোদিনও মাথা থেকে মুছতে পারবে না। কারণ ওর জীবনে এই প্রথমবার, ও কোনো একটা স্বপ্ন এত প্রগাঢ়, এত বন্য আর এত তীব্রভাবে দেখল... আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিল ইন্দিরা। ওর নিজের মা।
৫ই সেপ্টেম্বর, সকাল ৯:১০ মিনিট।
সেন বাড়ির ডাইনিং স্পেসে সকালের রোদ এসে পড়েছে। রাহুলের আজ কলেজে যাওয়ার তাড়া আছে; ওদের ডিপার্টমেন্ট থেকে একটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট ওয়ার্কশপ অর্গানাইজ করা হয়েছে। অন্যদিকে ইন্দিরারও আজ পার্ক স্ট্রিটের এশিয়াটিক সোসাইটিতে একটা ইনভাইটেড গেস্ট লেকচার দেওয়ার কথা। খাবার টেবিলে রাহুল, ইন্দিরা আর সুব্রত—তিনজনেই বসে আছেন। রান্নাঘর থেকে গঙ্গা মাসির খুন্তি নাড়ার আর ছ্যাঁকছোঁক আওয়াজ ভেসে আসছে। টেবিলে টোস্ট, ডিম আর চায়ের চেনা গন্ধ। পরিবেশটা একেবারে সাধারণ, শহুরে আর রুটিনমাফিক। কথাবার্তাগুলো মূলত সুব্রতর উদ্যোগেই চলছে—রাহুলের ওয়ার্কশপের বিষয়, ইন্দিরার লেকচারের টপিক, আর সুব্রতর নিজের ব্যবসার খুঁটিনাটি নিয়ে।
"শোন রাহুল," সুব্রত তাঁর টোস্টে মাখন মাখাতে মাখাতে বেশ গুরুগম্ভীর গলায় বললেন, "তোর ওই ওয়ার্কশপটা নিয়ে কিন্তু একটু সিরিয়াসলি ভাবিস। শুধু লেকচার শুনলেই হবে না, বাইরে থেকে ওরম টপ রিসার্চাররা আসছেন, ওদের সাথে গিয়ে কথা বলিস। এখন থেকে নেটওয়ার্কিং করাটা দরকার। "
"হ্যাঁ বাবা, আমি জানি," রাহুল নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়েই অত্যন্ত সংক্ষেপে উত্তর দিল।
খাওয়া আর কথাবার্তা চলতে লাগল।
"বুঝলে ইন্দিরা, কালকের দিনটা আমার জন্য সাংঘাতিক ক্রুশিয়াল," সুব্রত চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে ইন্দিরার দিকে তাকালেন। "ওই যে 'ভিভান্তা গ্রুপ'-এর কথা বলেছিলাম না? কাল সকালে ওদের সাথে আমাদের ফাইনাল পিচিং। টেক্সটাইল রিটেইলে ওরা দেশের ওয়ান অব দ্য বিগেস্ট প্লেয়ারস। এই ডিলটা ক্র্যাক করতে পারলে আমাদের কোম্পানির টার্নওভার এক লাফে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভাবতেও পারবে না! আগামী বছর আমাদের আইপিও আনার যে প্ল্যানটা আছে, সেটা পুরোপুরি এই প্রজেক্টের সাকসেসের ওপর ডিপেন্ড করছে।"
ইন্দিরা কফিমগে চুমুক দিয়ে অত্যন্ত প্রফেশনাল ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। "আচ্ছা আচ্ছা, আই আন্ডারস্ট্যান্ড। এই ক্লায়েন্টরা কোন দিকটায় বেশি ফোকাস করবে মনে হয়?"
"ওরা আমাদের সাপ্লাই চেইনের ব্যাকআপ আর ফিনান্সিয়াল ভায়াবিলিটি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে, আমি সিওর," সুব্রত বেশ চিন্তিত গলায় বলতে লাগলেন। "তাই অরিন্দমকে বলেছি কালকের আগে সমস্ত ডেটা পয়েন্টস আর ফোরকাস্ট শিট যেন আমার ফিঙ্গারটিপসে থাকে। অফিসের নতুন কনফারেন্স রুমটার রেনোভেশন জাস্ট কমপ্লিট হলো, আমি আর অরিন্দম আজ বিকেলেই ওখানে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য বসব। পুরো প্রেজেন্টেশনটা একদম সলিড হতে হবে, কোনো লুপহোল রাখা চলবে না।"
এই দীর্ঘ, হিসেবি বকবকানির পুরো সময়টা জুড়ে ইন্দিরা খুব সন্তর্পণে রাহুলের দিকে নজর রাখছিলেন। তিনি লক্ষ করছিলেন যে ছেলেটা আজ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি চুপচাপ। ওর ওই চপল, প্রাণোচ্ছ্বল মুখটাতে কেমন একটা ধূসর মেঘ জমে আছে। ও প্লেটের খাবারের সাথে শুধু চামচ দিয়ে খেলা করছে, আর প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা কথাও বলছে না। এমনকি ইন্দিরার দিকে সরাসরি চোখ তুলেও তাকাচ্ছে না। মায়ের মন তো, সন্তানের মুখের সামান্যতম পরিবর্তনও তাঁর নজর এড়ায় না। ইন্দিরা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিলেন, ছেলেটার মনের ভেতর ঠিক কী চলছে।
গতকাল বিকেলে এলিয়ট পার্কে ওই দেবলীনার চলে যাওয়ার পর, তিনি রাহুলের সাথে যে রূঢ় এবং রুক্ষ আচরণটা করেছিলেন, ছেলেটা সেই ধাক্কাটা এখনও সামলে উঠতে পারেনি। ইন্দিরা মনে মনে নিজেকে শতবার ধিক্কার দিচ্ছিলেন। রাহুল তো কোনো অন্যায় করেনি! ও তো ওর স্বভাবমতো একজন ভদ্র, মিষ্টি ছেলের মতোই দেবলীনার কথার উত্তর দিচ্ছিল। আসল সমস্যাটা তো ছিল ইন্দিরার নিজের মনের ভেতরে। তাঁর ওই অন্ধ, বন্য ইগো আর দেবলীনার প্রতি জমে থাকা ওই অহেতুক ঈর্ষাটাই তাঁকে অন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেই রাগের পুরো প্রজেকশনটা গিয়ে পড়েছিল বেচারা রাহুলের ওপর। বিনা দোষে ছেলেটাকে তিনি এতটা অবজ্ঞা করে, পর করে দিয়েছিলেন! এই ছেলেটা, যার কাল জন্মদিন... সেই ছেলেটা আজ ডাইনিং টেবিলে কী করুণ একটা মুখ করে বসে আছে! মা রেগে আছে, এই ভেবে হয়তো ছেলেটা মাথা নিচু করে চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে, আমার দিকে ঠিক করে তাকাতেও পারছে না।
ইন্দিরার খুব ইচ্ছে করছিল, এই মুহূর্তে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে বলতে—'সরি রে বাবু... আমি তোর ওপর একদম রেগে নেই রে... আমাকে মাফ করে দে সোনা... কাল আমি একটু ঘোরের মধ্যে ছিলাম... তোর মা তোকে বড্ড ভালোবাসে রে... তোর ওপর কি মা কোনোদিন রাগ করতে পারে?'
তিনি ওর ওই ফর্সা, তীক্ষ্ণ চোয়ালের রেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওর ওই টানা টানা চোখ, যেখানে আজ একটা চাপা অভিমান জমে আছে, ওর মুখের ওই অবিন্যস্ত চুলে মেশানো এক অদ্ভুত, কাঁচা পুরুষালি সৌন্দর্য—সবকিছু মিলিয়ে রাহুলকে আজ ইন্দিরার চোখে এক অন্যরকম মোহময় লাগছিল। তাঁর মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল গত মাঝরাতের সেই হাড়হিম করা, অথচ মাদকতাময় উপলব্ধিটা—"তবে কি... তিনি... তাঁর নিজের ছেলেকে... তাঁর ভিতরে চান?" ওই শব্দগুলো, ওই অমেয়, অবদমিত তৃষ্ণাটা তাঁর বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাচ্ছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির কারণে তিনি এখন সম্পূর্ণ নিরুপায়। সুব্রতর সামনে তিনি ছেলেটাকে একটা সামান্য আদরের স্পর্শও করতে পারবেন না, ওর ওই অভিমান ভাঙানোর কোনো উপায়ই এখন তাঁর হাতে নেই। ঠিক এক ডেজাভুর মতোই অনুভূতি হলো ইন্দিরার; দু'দিন আগে খাওয়ার টেবিলে বসে মনের গভীরে যে মোচড়টা লেগেছিল, আজও ঠিক তেমনই একটা ব্যথা অনুভব করলেন তিনি।
তাঁর এই স্তব্ধ, যন্ত্রণাকাতর ভাবনার সুতোটা ছিঁড়ে গেল তাঁর ফোনের রিংটোনের শব্দে।
ইন্দিরা একটু চমকে উঠে ফোনটা হাতে নিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটির পাঠানো গাড়ির ড্রাইভার কল করছে। সে জানাল যে গাড়ি বাড়ির গেটের নিচে চলে এসেছে। ইন্দিরা দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন। সাড়ে ন'টা বাজতে চলল। তাঁকে এবার চটপট তৈরি হয়ে বেরোতে হবে, নাহলে ট্রাফিকে আটকে গেলে লেকচারের সময় পেরিয়ে যাবে। তিনি তড়িঘড়ি নিজের প্লেটটা নিয়ে উঠে রান্নাঘরের দিকে গেলেন।
সুব্রতও তাঁর খাওয়া শেষ করে হাত মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ালেন। "ঠিক আছে, আমি চললাম। আগে গিয়ে চানটা সেরে নিই। তারপর অরিন্দমের মিটিংটার জন্য ফাইলগুলো একটু গুছিয়ে রাখতে হবে।" এই বলে তিনি সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন।
রাহুল তখনও টেবিলে বসে খুব ধীরে ধীরে ওর শেষ পাঁউরুটির টুকরোটা চিবোচ্ছিল। ইন্দিরা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে একবার রাহুলের ওই নত মুখের দিকে তাকালেন, একটা প্রচ্ছন্ন, অসহায় দীর্ঘশ্বাস তাঁর বুক চিরে বেরিয়ে এল। তারপর তিনিও কোনো কথা না বলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।
ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সাড়ে ন'টা। রাহুল নিচের তলার ডাইনিং স্পেসে ওর ব্রেকফাস্টের শেষ অংশটুকু শেষ করল। প্লেটের ওপর চামচ নামিয়ে রাখার ওই চেনা, মৃদু ঠং শব্দটা সকালের ওই নিস্তব্ধতার মধ্যে মিলিয়ে গেল। ও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কাঠের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। ওর মগজের অর্ধেকটা তখন সামনের ওয়ার্কশপের ভাবনায় ব্যস্ত। সিঁড়ির মাঝামাঝি পৌঁছাতেই ওপর তলার ল্যান্ডিং-এর বাঁ দিকের বাথরুম থেকে জলের একটানা, তীব্র ঝমঝম শব্দ ওর কানে এল। বাবা বাথরুমের দরজা বন্ধ করে স্নান করছে। দোতলার ওই লম্বা, বাঁধানো করিডোরটা এখন ওর চোখের সামনে। নিজের ঘরে পৌঁছতে গেলে ওকে ওই করিডোর ধরে হেঁটে যেতে হবে, আর পথেই পড়বে ওর মায়ের শোবার ঘর।
রাহুল স্বাভাবিক পায়েই হেঁটে যাচ্ছিল। ইন্দিরার ঘরের দরজার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়, ঘরের ভেতর থেকে আসা সকালের সেই নরম, উজ্জ্বল আলোর একটা ছটা ওর চোখের কোণে এসে পড়ল। ও নামমাত্র পলক ফেলেই এগিয়ে গেল আরও দু'পা। কিন্তু হঠাৎ করেই ওর পা দুটো করিডোরের মাঝখানে যেন আঠা দিয়ে সেঁটে গেল।
দরজাটা কি... দরজাটা কি একটু ফাঁক করা ছিল?
রাহুল ভুরু কুঁচকে দু'সেকেন্ড আগের স্মৃতিটা হাতড়ে দেখার চেষ্টা করল। ও কি ঠিক দেখল? নাকি ওর মনের ভুল? মায়ের ঘরের দরজা তো এই সময়টায় সবসময় বন্ধ থাকে। মা যখন বেরোনোর জন্য রেডি হয়, শাড়ি-ব্লাউজ পরে, তখন তো দরজা নিশ্ছিদ্রভাবে ভেতর থেকে লক করা থাকে। হয়তো আলোর কোনো রিফ্লেকশনের জন্য ওর ওরকম মনে হলো। নাকি... নাকি সত্যিই খোলা আছে? বুকের ভেতরটা কেন যেন একটু ছলাৎ করে উঠল। কয়েক মুহূর্তের এক অজানা, স্নায়বিক দোটানার পর, ও খুব ধীর পায়ে, প্রায় নিঃশব্দে আবার পেছন দিকে কয়েক পা হেঁটে গিয়ে ওই দরজার ফ্রেমের সামনে এসে দাঁড়াল।
হ্যাঁ... দরজাটা সত্যিই খোলা। ও প্রথমবার যতটা ভেবেছিল, দরজাটা তার চেয়ে বেশ খানিকটা বেশিই খোলা।
সেই ফাঁক দিয়ে রাহুলের দৃষ্টি ঘরের ভেতর গিয়ে পড়ল। ও দেখতে পেল সেই চেনা কাঠের বিশাল বিছানাটা, যার ওপর পাতা রয়েছে নিখুঁত সাদা প্রিন্টেড চাদর। জানলা দিয়ে সকালের রোদ এসে বিছানার এক কোণে একটা মায়াবী আলোর জ্যামিতি তৈরি করেছে। আর বিছানার ঠিক মাঝখানে, খুব পরিপাটি করে ভাঁজ করে রাখা আছে একটা অত্যন্ত রুচিশীল, ঘিয়ে রঙের শাড়ি। তার মানে মা এখনও শাড়িটা পরেনি। রাহুলের পায়ের পেশিগুলো এক অজানা আশঙ্কায় আর রোমাঞ্চে সামান্য কেঁপে উঠল। ওর মনে হলো, এক্ষুনি এখান থেকে সরে যাওয়া উচিত। মা হয়তো খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে রেডি হতে গিয়ে দরজাটা আটকাতে ভুলে গেছে। ওর এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা একদমই ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু ওর মগজ ওকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও, ওর পা দুটো যেন কোনো এক আদিম, চুম্বকীয় আকর্ষণে ওই মেঝের সাথেই আটকে রইল। আর ঠিক তখনই, সে প্রত্যক্ষ করল এক অভাবনীয়, রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত।
দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা ঘরের ডানদিকের ফ্রেম থেকে, খুব ধীর, আলস এবং মোলায়েম পায়ে একটা অবয়ব এসে ঢুকল রাহুলের দৃষ্টিসীমার মধ্যে। ইন্দিরা। তিনি বিছানার দিকে এগিয়ে গেলেন ওই ঘিয়ে রঙের শাড়িটা তোলার জন্য।
রাহুল যেন এক লহমায় পাথর হয়ে গেল।
ইন্দিরা রাহুলের দিকে সম্পূর্ণ পিঠ করে, ওই কার্পেটের ওপর খালি পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর দীর্ঘ, কালো রেশমি চুলগুলো কোনো ক্লিপের বাঁধন ছাড়াই সম্পূর্ণ খোলা, যা নিচে নেমে এসে তাঁর নরম কাঁধের বাঁকগুলোকে ছুঁয়ে আছে। তাঁর পরনে কোনো শাড়ি, কোনো সায়া, কোনো ব্লাউজ, কোনো ব্রা নেই। পুরো শরীরে কেবল একটা গাঢ় বাদামি রঙের প্যান্টি। কাপড়টা তাঁর শরীরে ঠিকমতো অ্যাডজাস্ট করা ছিল না, একটু ওপরের দিকে উঠে যাওয়ার ফলে তাঁর সুডৌল, ভারী বাম নিতম্বের প্রায় পুরোটাই উন্মুক্ত হয়ে রাহুলের চোখের সামনে প্রকট হয়ে উঠেছে। তাঁর শরীরের বাকি অংশ সম্পূর্ণ নগ্ন—মসৃণ, উষ্ণ এবং এক নরম পেলবতায় মোড়া। তাঁর কোমরটা চওড়া আর মাতৃসুলভ, আর তিনি যখন শাড়িটা তোলার জন্য সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকলেন, তখন তাঁর কোমরের নিচের ওই মাংসল, নরম অংশটা এক অদ্ভুত, মোহময় ছন্দে দুলে উঠল। তাঁর পিঠের নিচের দিকের ওই নরম খাঁজটা থেকে শুরু করে নিতম্বের ওই সুডৌল স্ফীতি, আর সেখান থেকে নেমে যাওয়া তাঁর ফর্সা, মসৃণ এবং ভারী উরুদুটো—সবকিছু সকালের ওই উজ্জ্বল আলোয় যেন এক অপার্থিব, জীবন্ত ভাস্কর্যের মতো জ্বলজ্বল করতে লাগল। তখন ইন্দিরা যেন জাগতিক কোনো মানুষ নন; তিনি যেন কোনো নিভৃত, গোপন মন্দিরের এক আরাধ্যা দেবী—সকালের আলো তাঁর শরীরের প্রতিটা বাঁক, প্রতিটা উপত্যকা, আর ওই অনাবৃত, প্রশস্ত নিতম্বের পেলবতাকে নিখুঁত আর পবিত্রভাবে উদ্ভাসিত করে তুলেছিল। তাঁর ওই প্রায় সম্পূর্ণ অনাবৃত রূপের এই অপ্রত্যাশিত, বন্য সৌন্দর্য রাহুলের মগজকে সম্পূর্ণভাবে অবশ করে দিল।
https://iili.io/ndNsb8Q.png
ইন্দিরা বিছানা থেকে শাড়িটা তুলে নিলেন এবং ঠিক একই রকম ধীর, মসৃণ ছন্দে আবার ফ্রেমের বাইরে, ড্রেসিং টেবিলের দিকে চলে গেলেন। এই পুরো দৃশ্যটা স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েকটা সেকেন্ড। কিন্তু ওই কয়েকটা সেকেন্ডই ছিল রাহুলের পুরো সত্তাকে এক সর্বগ্রাসী কামনার আগুনে জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।
রাহুলের বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের দামামা এমনভাবে বাজতে শুরু করল যে ওর মনে হলো সেই শব্দটা ওর গলার কাছে উঠে এসে ফেটে পড়বে। ওর ফর্সা মুখমণ্ডল এক প্রবল, উত্তপ্ত রক্তস্রোতে লাল হয়ে উঠল; ওর শ্বাসপ্রশ্বাস এতটাই অগভীর হয়ে গেল যে মনে হচ্ছিল ফুসফুসে অক্সিজেন পৌঁছাচ্ছে না। তলপেটের ঠিক নিচে এক তীব্র, অনিয়ন্ত্রিত টান ও অনুভব করল, আর ওর পা দুটো এমনভাবে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল যেন পায়ের তলার মেঝেটা কোনো ভূমিকম্পে দুলছে। ওর চোখের রেটিনায় তখন খোদাই হয়ে গেছে ওই কয়েক সেকেন্ডের ছবিটা—মায়ের ওই উন্মুক্ত, ভারী নিতম্বের খাঁজ, ওই উঠে থাকা বাদামি প্যান্টি, আর ওই ফর্সা, মসৃণ পিঠের পেলবতা। ও আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াতে পারল না। এক চরম নার্ভাসনেস, আতঙ্ক আর বন্য উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে, ও প্রায় পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে ছুটে নিজের ঘরের দিকে পালিয়ে গেল এবং ভেতরে ঢুকেই সশব্দে দরজাটা লক করে দিল।
--------
সময় কেবল সামনের দিকেই হাঁটে, তাকে কোনোদিন পেছনে ফেরানো যায় না। কিন্তু যদি এই গল্পের সময়টাকে মাত্র পাঁচটা মিনিট পেছনে, সকাল ৯:২৫-এ ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়?
সকাল ৯:২৫।
রাহুল তখনও ডাইনিং টেবিলে বসে ওর ব্রেকফাস্টের শেষ পাঁউরুটিটা চিবোচ্ছে। সুব্রত তাঁর খাওয়া শেষ করে একটু আগেই দোতলায় উঠে গেছেন স্নান করার জন্য। ইন্দিরা নিজের প্লেটটা নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন। সেখানে গঙ্গা মাসি বেসিনে কিছু বাসন ধুচ্ছে।
"গঙ্গা, তুই কি লিভিং রুমটা মুছেছিস?" ইন্দিরা অত্যন্ত স্বাভাবিক, কিন্তু একটু চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
গঙ্গা মাসি হিন্দিতে উত্তর দিল, "নহী ম্যাডাম জি, ম্যায় সোচ রহি থি পহলে উপর কা ফ্লোর সাফা কর দুঙ্গী, ফির নিচে কা লিভিং রুম পোছা লগা লুঙ্গী।"
ইন্দিরা এক মুহূর্তও না ভেবে, অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে বললেন, "না, তুই বরং এক কাজ কর। আগে নিচের লিভিং রুমটাই ভালো করে মুছে নে। দোতলার কাজটা তার পরে করিস।"
গঙ্গা মাসি মাথা নেড়ে বলল, "ঠিক হ্যায় ম্যাডাম জি।" কোনো বাড়তি প্রশ্ন করার সাহস বা প্রয়োজন ওর নেই।
ইন্দিরা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁর চোখ একবার রাহুলের দিকে গেল। ছেলেটা মাথা নিচু করে, একবুক অভিমান আর শূন্যতা নিয়ে চুপচাপ খাচ্ছে। তিনি কোনো কথা না বলে, ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে এলেন।
ইন্দিরা নিজের শোবার ঘরে ঢুকলেন। তারপর, তাঁর রোজকার অভ্যাসমতোই, তিনি দরজাটা ভেতর থেকে সশব্দে লক করে দিলেন। তারপর, তিনি আলমারির সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং আজকের পরার জন্য তাঁর সেই রুচিশীল, ঘিয়ে রঙের শাড়িটা বের করলেন। তাঁর পরনের ঘরের শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ—সবকিছু তিনি একে একে খুলে ফেললেন। তাঁর অন্তর্বাস এবং অন্যান্য কাপড়গুলো ড্রেসিং টেবিলের সামনের চেয়ারটার ওপর আগে থেকেই গোছানো ছিল। তিনি এখন আক্ষরিক অর্থেই সম্পূর্ণ নগ্ন, পরনে শুধু তাঁর ওই বাদামি রঙের প্যান্টিটা। তিনি ঘিয়ে শাড়িটা নিয়ে বিছানার ওপর খুব পরিপাটি করে করে রাখলেন।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে তিনি চুল আঁচড়াতে লাগলেন।
তাঁর মনের আয়নায় ভেসে উঠল রাহুলের সেই বিষণ্ণ, মেঘলা মুখটা। ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা ছেলেটার ওই করুণ, আহত চাউনিটা তাঁকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিল। তিনি গতকাল বিকেলে পার্কে যে অমার্জনীয় রূঢ়তা দেখিয়েছিলেন, তার জন্য ছেলেটার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আর এই মুহূর্তে, এই সময়ের অভাবে তিনি ওকে বুকে টেনে নিয়ে একটা সান্ত্বনার চুমুও খেতে পারছেন না। তাঁর খুব ইচ্ছে করছিল ছেলেটার ওই শূন্য বুকটাকে কোনো না কোনোভাবে ভরিয়ে দিতে, ওর ওই জমাট বাঁধা অভিমানের বরফটাকে গলিয়ে দিতে। কিন্তু সময় কোথায়? সুব্রত বাথরুমের ভেতর, রাহুল একটু পরেই রেডি হয়ে কলেজ যাবে।
ইন্দিরা আয়নার দিকে তাকিয়ে একটা গভীর, কাঁপানো শ্বাস নিলেন।
তিনি খুব ধীরে ধীরে, যন্ত্রচালিতের মতো ড্রেসিং টেবিল থেকে সরে এসে দরজার কাছে গেলেন। তাঁর আঙুলগুলো লকের হাতলটা স্পর্শ করল। তিনি এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজলেন। তাঁর ভেতরের প্রাজ্ঞ, সমাজসচেতন সত্তাটা চিৎকার করে তাঁকে আটকাতে চাইল, কিন্তু তাঁর অন্ধ, সর্বগ্রাসী মাতৃসত্তা—যে সত্তা তাঁর ছেলের একটুখানি সুখের জন্য, ওর তৃষ্ণার্ত চোখদুটোকে একটুখানি আরাম দেওয়ার জন্য পৃথিবীর যেকোনো চরম সীমায় যেতে প্রস্তুত—সেই সত্তাটা আজ জয়ী হলো।
তিনি লকের ছিটকিনিটা অত্যন্ত নিঃশব্দে নামিয়ে দিলেন। তারপর দরজাটা খুব সন্তর্পণে, মেপে মেপে ঠিক ততটাই ফাঁক করে রাখলেন, যাতে করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বিছানাটা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
দরজাটা ভুল করে খোলা ছিল না। তাড়াহুড়োর কোনো প্রশ্নই ছিল না।
দরজাটা তিনি নিজেই খুলে রেখেছিলেন।
তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, ঠিক আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাহুল ওই সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসবে। তিনি জানতেন, ছেলেটার নজর ওই খোলা দরজার দিকে পড়বেই। তিনি চেয়েছিলেন... তিনি আক্ষরিক অর্থেই চেয়েছিলেন যে ছেলেটা তাঁকে ওই অবস্থায় দেখুক। তাঁর সময় ছিল না ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করার, ওর সাথে কথা বলার। তাই তিনি... তিনি এমন একটা কাজ করলেন... যা ওর হৃদয়ের ওই যন্ত্রণার শীতলতাকে এক অদ্ভুত, আদিম উত্তাপে ভুলিয়ে দেবে। তিনি নিজেকে... নিজের ওই একান্ত গোপন, অনাবৃত রূপটাকে... নিজের ছেলের চোখের সামনে এক নীরব, দৃশ্যমান প্রলেপ হিসেবে মেলে ধরলেন... শুধু ওর ওই আহত, তৃষ্ণার্ত মনটাকে একটুখানি শান্তি দেওয়ার জন্য।
(continued in the next post....)